মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ থেকে চীন পর্যন্ত প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছে সরকার। এই উদ্যোগকে ঘিরে কোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক শঙ্কা দেখছে না বাংলাদেশ। বরং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে করিডোর বাস্তবায়নের বিষয়ে আগ্রহী ঢাকা। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার আগে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলকে বিদায় জানানোর পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাবনা, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কথা বলেন তিনি।
প্রস্তাবিত করিডোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগে ঢাকা কোনো ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ দেখছে না। বরং এ ধরনের একটি করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অবস্থান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের বন্দরসুবিধা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে স্থল ও সমুদ্রপথে যোগাযোগের সুযোগ বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে। প্রস্তাবিত করিডোর বাস্তবায়িত হলে এই ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে সরাসরি অর্থনৈতিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে পণ্য পরিবহন, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সরবরাহব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদিত পণ্য পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিকল্প যোগাযোগপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় ও সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পণ্য পরিবহনে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হলে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে পরিবহনের সময় কমানো, সরবরাহব্যবস্থা সহজ করা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব। প্রস্তাবিত করিডোর বাস্তবায়িত হলে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটা সুবিধা পাবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের কাঠামো, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর।
তবে এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন কেবল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে চলমান অস্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে স্থিতিশীল পরিবেশ ও পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজারসহ বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। তাঁদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে বাংলাদেশকে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। কিন্তু মিয়ানমারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের সঙ্গে বেইজিংয়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে চীন কূটনৈতিকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করে বাংলাদেশ। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি যুক্ত করার মধ্য দিয়ে ঢাকা আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং মানবিক সমস্যার সমাধানকে একই আলোচনার আওতায় আনতে চাইছে বলে প্রতীয়মান হয়।
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের তিন দিনের বাংলাদেশ সফরও এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। সফরকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে যে আলোচনা চলছে, সেটিকে তিনি হাস্যকর বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে দেশে ফিরে আসার বিষয়টি প্রযোজ্য নয়; বরং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচ্য।
প্রতিমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘পলাতক সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যায়িত করেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক ও সরকারি অবস্থান থেকে দেওয়া মন্তব্য। তিনি স্পষ্ট করেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাধারণ প্রত্যাবর্তনের পরিবর্তে আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে বৃহস্পতিবার একই বিষয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার জন্য কোনো সাধারণ পাসপোর্ট বা ট্রাভেল পাস ইস্যু করা হবে না।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির বিধান, সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া এবং ভারতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে ঘোষিত মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রত্যর্পণসংক্রান্ত আলোচনাকে আরও জটিল ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। ফলে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবারের বক্তব্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। একদিকে চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরির আগ্রহ, অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব। প্রস্তাবিত করিডোর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময় হলেও এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সমঝোতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান ছাড়া এই উদ্যোগ কতটা এগোতে পারে, সেটিই এখন বাংলাদেশের কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকছে।


