ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদকে মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে করা মামলায় আত্মসমর্পণের পর জামিন পেয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত শুনানি শেষে ৫০০ টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন। এর আগের দিন আদালতে হাজির না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। সেই পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতেই বৃহস্পতিবার আদালতে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন তিনি।
আদালত সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আত্মসমর্পণ করতে আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছান পরীমনি। এ সময় তার সঙ্গে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীরা ছিলেন। পরে বেলা ১১টা ৪১ মিনিটের দিকে তিনি এজলাসে উপস্থিত হন। তার আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভী জামিনের আবেদন করলে আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে বিচারক মাহফুজুর রহমান ৫০০ টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন। জামিন পাওয়ার পর দুপুরের দিকে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন এই অভিনেত্রী।
আদালত প্রাঙ্গণে পরীমনির উপস্থিতিকে ঘিরে সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়। শুনানি শেষে বের হওয়ার সময় তার সঙ্গে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে। পরে গাড়িতে ওঠার সময় এক সাংবাদিক তার গায়ে হাত দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন পরীমনি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই সাংবাদিকের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয় এবং তার ফোন কেড়ে নিয়ে গালিগালাজ করার অভিযোগ ওঠে। পরে ফোনটি ফেরত দেওয়া হয়। আদালতকেন্দ্রিক এই পরিস্থিতি মামলার আইনি অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে আদালতে জামিন পাওয়া মানেই মামলার নিষ্পত্তি নয়। পরীমনির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক কার্যক্রম এখনো চলমান। মামলার অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং আদালতের পরবর্তী আদেশের মধ্য দিয়েই অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। তাই অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
পরীমনির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনা ঘটে বুধবার। ওই দিন মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারিত ছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে আদালতে হাজির হতে পারবেন না জানিয়ে তার আইনজীবীর মাধ্যমে সময়ের আবেদন করা হয়। আবেদনে বলা হয়, এলার্জিজনিত সমস্যায় পরীমনি অসুস্থ থাকায় আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি। তবে বাদীপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম মোহাম্মদ সোহেল ওই আবেদনের বিরোধিতা করেন। তার পক্ষ থেকে জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনও করা হয়। বাদীপক্ষের দাবি ছিল, আসামি ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতে হাজির না হয়ে বারবার সময়ের আবেদন করছেন, এতে বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে।
আদালত সময়ের আবেদন নাকচ করে পরীমনির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। একই সঙ্গে মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২৩ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ওই আদেশের পরদিনই আদালতে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন পরীমনি। পরে তার জামিন আবেদন শুনানি শেষে মঞ্জুর হওয়ায় আপাতত কারাগারে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে পরবর্তী তারিখে আদালতে হাজিরা দেওয়া এবং বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই মামলার সূত্রপাত ২০২১ সালে। ওই বছরের ৬ জুলাই ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ বাদী হয়ে পরীমনিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার অন্য দুই আসামি হলেন পরীমনির সহযোগী ফাতেমা তুজ জান্নাত বনি এবং কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমি, যিনি জিম নামেও পরিচিত। মামলায় মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ আনা হয়।
মামলার এজাহারে নাসির উদ্দিন মাহমুদ অভিযোগ করেন, ২০২১ সালের ৯ জুন রাত ১২টার পর পরীমনি ও তার সহযোগীরা সাভারের বোট ক্লাবে যান। সেখানে তারা ক্লাবের দ্বিতীয় তলার ওয়াশরুম ব্যবহার করেন এবং পরে ক্লাবের ভেতরে বসে অ্যালকোহল পান করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। বাদীর দাবি অনুযায়ী, রাত ১টা ১৫ মিনিটের দিকে তিনি ও তার সহযোগী শাহ শহিদুল আলম ক্লাব ত্যাগ করার সময় পরীমনি তাকে ডাকেন এবং কিছুক্ষণ বসার অনুরোধ করেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, একপর্যায়ে একটি ব্লু লেবেল অ্যালকোহলের বোতল বিনা মূল্যে পার্সেল দেওয়ার বিষয়ে কথা কাটাকাটি হয়। নাসির উদ্দিনের অভিযোগ, তিনি এতে রাজি না হওয়ায় পরীমনি তাকে গালমন্দ করেন। পরে বাদানুবাদের একপর্যায়ে তার দিকে সার্ভিং গ্লাস ও মোবাইল ফোন ছুড়ে মারা হয়, এতে তিনি মাথা ও বুকে আঘাত পান। পাশাপাশি তাকে মারধর, হত্যার হুমকি এবং ক্লাবের ভেতরে ভাঙচুরের অভিযোগও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসবই বাদীপক্ষের করা অভিযোগ; বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সেগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
মামলার এজাহারে নাসির উদ্দিন আরও দাবি করেন, ঘটনার পর বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরীমনি সাভার থানায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে পাল্টা মামলা করেন। দুই পক্ষের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনায় আসে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মামলার নিজস্ব তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে। একটি মামলার অভিযোগকে অন্য মামলার অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২৪ সালে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার পরিদর্শক মো. মনির হোসেন আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে পরীমনি ও জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে তৃতীয় আসামি ফাতেমা তুজ জান্নাত বনির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। আদালত পরে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন এবং পরীমনি ও জিমকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করেন।
এরপর ২০২৪ সালের ২৫ জুন পরীমনি ও জুনায়েদ বোগদাদী জিমি আদালতে হাজির হয়ে জামিন পান। পরবর্তী সময়ে গত বছরের ২৬ জানুয়ারি আদালত মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। ওই দিন পরীমনির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনাও ঘটে। পরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন লাভ করেন। সর্বশেষ বুধবার আদালতে হাজির না হওয়া এবং সময়ের আবেদন নাকচ হওয়ার পর আবারও তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। বৃহস্পতিবার আত্মসমর্পণের পর নতুন করে জামিন পেলেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মামলার বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে বিনোদন অঙ্গনেও আগ্রহ রয়েছে। জনপ্রিয় একজন অভিনেত্রীর নাম জড়িয়ে থাকায় মামলাটি শুরু থেকেই সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত। তবে আলোচনার বাইরে আইনি প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা এবং সাক্ষীদের বক্তব্য ও নথিপত্রের ভিত্তিতে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই এখন গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ২৩ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নির্ধারিত তারিখে মামলার কার্যক্রম কোন পর্যায়ে এগোয়, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।
পরীমনির বৃহস্পতিবারের জামিন আপাতত তার বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার পর আদালতে আত্মসমর্পণের পরবর্তী আইনি পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু মামলার মূল অভিযোগের বিচার এখনো বাকি। ফলে এই জামিনকে মামলার চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ ও পরবর্তী শুনানির মধ্য দিয়েই মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হবে।

