বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার নেতৃত্বে আবারও আস্থা রেখেছেন দলটির সদস্যরা। সিলেট জেলা শাখার আমির হিসেবে মাওলানা হাবিববুর রহমান এবং মহানগর শাখার আমির হিসেবে ফখরুল ইসলাম পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। দলীয় সদস্যদের গোপন ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। এর মধ্য দিয়ে সিলেটের জেলা ও মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক নেতৃত্বে আগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকল।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে দেশের ৭৭টি জেলা ও মহানগর শাখার আমিরের নাম ঘোষণা করা হয়। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত নেতাদের নাম প্রকাশ করেন। ঘোষিত তালিকায় সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার বর্তমান দুই আমিরের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের রুকনদের গোপন ভোটের মাধ্যমে নতুন মেয়াদের জন্য আমির নির্বাচন সম্পন্ন হয়। জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, রুকনরা দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যক্তিদের নাম পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এবারও সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিভিন্ন জেলা ও মহানগর শাখার নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়েছে।
সিলেট জেলা শাখায় মাওলানা হাবিববুর রহমানের পুনর্নির্বাচনকে দলটির স্থানীয় সাংগঠনিক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একইভাবে মহানগর শাখায় ফখরুল ইসলামের পুনর্নির্বাচনও নগরভিত্তিক সাংগঠনিক নেতৃত্বে আগের অবস্থান বজায় রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুই নেতার ওপর পুনরায় দায়িত্ব অর্পণের মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা, সাংগঠনিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার দায়িত্ব তাঁদের ওপরই থাকছে।
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অঞ্চল। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের ধরন ও পরিসর আলাদা হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে উভয় শাখার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। অন্যদিকে মহানগর শাখাকে নগর এলাকার ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন, কর্মসূচি এবং নাগরিক পর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়গুলো দেখভাল করতে হয়। ফলে দুই শাখায় নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা দলটির সাংগঠনিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
এবারের ঘোষিত নেতৃত্বের তালিকায় দেশের ২৭টি জেলা ও মহানগর শাখায় নতুন মুখ এসেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। অর্থাৎ অধিকাংশ সাংগঠনিক ইউনিটে আগের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও বেশ কয়েকটি এলাকায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে কোথাও নতুন নেতৃত্বকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও অভিজ্ঞ নেতাদের ওপর পুনরায় আস্থা রাখা হয়েছে। দলটির অভ্যন্তরীণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণের এই উদ্যোগকে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সিলেট বিভাগের অন্যান্য জেলাতেও এবারের নির্বাচনে নেতৃত্বে পরিবর্তন ও ধারাবাহিকতা—দুই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জ জেলা জামায়াতের নতুন আমির নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন। অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলা শাখায় পুনরায় আমির নির্বাচিত হয়েছেন কাজী মোখলিছুর রহমান। ফলে সিলেট বিভাগের চারটি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে সিলেট জেলা, সিলেট মহানগর ও হবিগঞ্জে আগের নেতৃত্ব বহাল থাকলেও সুনামগঞ্জে নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব পেয়েছে।
সুনামগঞ্জে অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিনের নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জেলা শাখায় নতুন নেতৃত্বের সূচনা হচ্ছে। নতুন দায়িত্বে তাঁকে জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম সমন্বয় করতে হবে। অন্যদিকে হবিগঞ্জে কাজী মোখলিছুর রহমানের পুনর্নির্বাচন আগের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। এসব পরিবর্তন ও পুনর্নির্বাচনের মাধ্যমে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম নতুন মেয়াদের জন্য সাজানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে দেশের সব জেলা ও মহানগর শাখার আমির নির্বাচনের প্রক্রিয়া একই সময়ে চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে কুমিল্লা মহানগর শাখার আমির নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে। সেখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার পর দলটির কেন্দ্রীয় সংগঠন সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রশ্নে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কুমিল্লা মহানগর শাখার সদ্য সাবেক আমির কাজী দ্বীন মুহাম্মদ এবং নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হককে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও হামলার ঘটনায় তাঁদের জড়িত থাকার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কুমিল্লা মহানগরের নির্বাচনী ফলাফল স্থগিত থাকায় সেখানে নতুন নেতৃত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা এখনো আসেনি।
একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব নির্বাচন শুধু পদবণ্টনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সম্পর্কও জড়িত। বিশেষ করে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের আমিররা স্থানীয় সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কার্যক্রমের গতি ও সাংগঠনিক সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ধারিত হয়।
সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াতের নেতৃত্বে হাবিববুর রহমান এবং ফখরুল ইসলামের পুনর্নির্বাচন তাই দলটির স্থানীয় সংগঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নতুন মেয়াদে তাঁদের সামনে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত করা, তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ জোরদার করা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে। একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা, জনসাধারণের প্রত্যাশা এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংগঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াও তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭টি জেলা ও মহানগর শাখার আমিরদের নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে দলটির সাংগঠনিক নেতৃত্ব নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় সম্পন্ন হয়েছে। সিলেট জেলা ও মহানগরে পুরোনো নেতৃত্বের পুনর্নির্বাচন, সুনামগঞ্জে নতুন আমিরের দায়িত্ব গ্রহণ এবং হবিগঞ্জে আগের নেতৃত্ব বহাল থাকার মধ্য দিয়ে বিভাগজুড়ে সাংগঠনিক নেতৃত্বের নতুন বিন্যাস তৈরি হয়েছে। এখন নতুন মেয়াদে এসব নেতা নিজ নিজ এলাকায় কীভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন, তা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।


