প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের গোয়াইনঘাটে পুলিশের অভিযানে ভারতীয় ফেনসিডিলের বড় একটি চালান উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় কুটিনা বেগম (৪০) নামে এক নারীকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টার দিকে উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নের পাতনী গ্রামে অভিযান চালিয়ে তার বসতঘর থেকে ১ হাজার ২০৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, উদ্ধার করা ফেনসিডিলের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৪ লাখ টাকা। সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাটে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়। আটক কুটিনা বেগম পাতনী গ্রামের তেরা মিয়ার স্ত্রী।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন স্থানে মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ ও পাচার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার রাতে পাতনী গ্রামে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় ফেনসিডিল মজুত থাকার তথ্য পায় পুলিশ। তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেন।
পরে রাত ১১টার দিকে পুলিশের একটি দল কুটিনা বেগমের বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তল্লাশির একপর্যায়ে বসতঘরের ভেতরে সংরক্ষিত অবস্থায় ফেনসিডিলের বোতলগুলো পাওয়া যায়। গণনা করে মোট ১ হাজার ২০৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়। এরপর ঘটনাস্থল থেকেই কুটিনা বেগমকে আটক করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ বড় হওয়ায় এটি কোনো সাধারণ ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিষয় নয়; বরং এর সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে মাদক সরবরাহ বা মজুতের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কী ধরনের অপরাধের সঙ্গে আটক নারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, কুটিনা বেগম দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ ও এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্তের বিষয়। উদ্ধার করা মাদকের উৎস, এটি কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে গোয়াইনঘাটে এসেছে এবং এর সম্ভাব্য গন্তব্য কোথায় ছিল—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালান ও মাদকের বিস্তার রোধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ, মজুত ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
গোয়াইনঘাটের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এলাকাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় দুর্গম ও প্রত্যন্ত বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে চোরাচালানের চেষ্টা হয়ে থাকে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জানানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকার নদীপথ, পাহাড়ি পথ ও গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার কিছু অংশ অপরাধীরা অবৈধ পণ্য পরিবহনে ব্যবহার করার চেষ্টা করে থাকে। ফলে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালানোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাদকদ্রব্যের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মাদকের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়লে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি হতে পারে। মাদকাসক্তির কারণে শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও পারিবারিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতা বাড়ার আশঙ্কাও থাকে। এ কারণে সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধ করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মাদকের চাহিদা কমানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফেনসিডিল বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত নাম। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে এই ধরনের মাদক প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে বড় বড় চালান উদ্ধার করলেও চোরাচালান বন্ধে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। সীমান্তে নজরদারি, স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্যের কার্যকর ব্যবহার এবং মাদক কারবারের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
গোয়াইনঘাটের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও মাদকবিরোধী অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রত্যন্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার ঘটলে তা স্থানীয় তরুণ ও কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে। এসব অভিযানে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পাশাপাশি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক করা হচ্ছে। তবে একটি চালান উদ্ধার বা একজনকে আটকের মধ্য দিয়ে মাদক চোরাচালানের পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ করা সম্ভব নয়। উদ্ধার হওয়া মাদকের পেছনে কারা রয়েছে, অর্থের লেনদেন কীভাবে হয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে আর কারা যুক্ত—এসব তথ্য বের করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গোয়াইনঘাটের এই অভিযানের ক্ষেত্রেও উদ্ধার করা ১ হাজার ২০৫ বোতল ফেনসিডিলের উৎস শনাক্ত করা এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা এখন পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মাদকগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, কীভাবে তা এলাকায় আনা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কোথায় পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল—তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকবিরোধী কার্যক্রমে তথ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতন নাগরিকদের কাছ থেকে পাওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অনেক সময় বড় চালান শনাক্ত করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযানের পর তদন্ত কার্যক্রম যথাযথভাবে এগিয়ে নেওয়াও জরুরি।
আটক কুটিনা বেগমের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। উদ্ধার করা মাদকদ্রব্যের নমুনা ও অন্যান্য আলামত আইনানুগ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা হতে পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা ও পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
তবে কোনো ব্যক্তিকে আটকের পর তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের অভিযোগের পাশাপাশি তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং আদালতের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করবে।
গোয়াইনঘাট থানার ওসি ওমর ফারুকের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালান ও মাদকের বিস্তার ঠেকাতে পুলিশের কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে চালানো হলে সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক দুর্বল করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে এর বিস্তারও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।
রোববার রাতের অভিযানে ১ হাজার ২০৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধারের ঘটনা তাই শুধু একটি বড় মাদক চালান আটকের খবর নয়; সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতারও একটি উদাহরণ। এখন এই অভিযানের পরবর্তী তদন্ত কতদূর এগোয়, উদ্ধার করা মাদকের প্রকৃত উৎস কীভাবে শনাক্ত হয় এবং এর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সেদিকেই নজর থাকবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মাদকের বিস্তার রোধে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।


