প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুলনায় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬-২৭’ প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় আসরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেল পৌনে ৪টার দিকে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ ক্রীড়া আয়োজনের উদ্বোধন করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের ক্রীড়াঙ্গনে যুক্ত করা, তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতের খেলোয়াড় তৈরির লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছে এবারের আসর।
খুলনা জেলা স্টেডিয়ামকে কেন্দ্র করে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী প্রতিযোগিতাটির কার্যক্রম শুরু হয়। আয়োজকদের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, খুলনা থেকে একযোগে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরের উদ্বোধন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ফলে এটি কেবল একটি জেলা বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের ক্রীড়া আয়োজন নয়; বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ খেলোয়াড়দের একই প্রতিযোগিতার আওতায় নিয়ে আসার একটি বৃহৎ উদ্যোগ।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুলনা সফরের অংশ হিসেবে মোংলা বন্দর এলাকা থেকে বাগেরহাটে যান। সেখানে তিনি খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। পরে কাটাখালী হয়ে কুদির বটতলা পেরিয়ে খুলনা সার্কিট হাউজে পৌঁছান। এরপর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী তিনি খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে যান এবং নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে খুলনা ও আশপাশের এলাকায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসর নিয়ে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের আগ্রহের অন্যতম কারণ এর ব্যাপক অংশগ্রহণ। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য অনলাইনে ১৬ লাখ ২৩ হাজার ২১৮ জন নিবন্ধন করেছেন। প্রথম আসরে নিবন্ধিত প্রতিযোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার। সে হিসাবে দ্বিতীয় আসরে নিবন্ধনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, তৃণমূল পর্যায়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আয়োজনটি বড় পরিসর পেয়েছে।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নকে এই প্রতিযোগিতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাই করে ধাপে ধাপে সামনে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতাটিকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নিবন্ধিত প্রতিযোগীদের মধ্য থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে দল গঠন ও বাছাই কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতা দেখানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রথম আসরের তুলনায় দ্বিতীয় আসরে নিবন্ধনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে আয়োজকেরা প্রতিযোগিতার প্রতি আগ্রহের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তবে শুধু নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়লেই একটি ক্রীড়া আয়োজনের সাফল্য নিশ্চিত হয় না। প্রতিযোগিতার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছ বাছাই, প্রশিক্ষণের সুযোগ, দক্ষ প্রশিক্ষক, প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিভাবান শিশুদের যেন সুযোগের অভাবে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়তে না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মূল লক্ষ্য তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভা খুঁজে বের করা। দেশের অনেক এলাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ থাকলেও পর্যাপ্ত মাঠ, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত। শহরকেন্দ্রিক ক্রীড়া অবকাঠামোর বাইরে থাকা এসব প্রতিভা অনেক সময় যথাযথ পরিচর্যার অভাবে হারিয়ে যায়। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়ানো গেলে সেই সীমাবদ্ধতা কিছুটা কমতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হলে জাতীয় পর্যায়ের ক্রীড়াঙ্গনেও নতুন মুখ উঠে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
শিশু-কিশোরদের জীবনে খেলাধুলার গুরুত্ব কেবল পদক বা পুরস্কার অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত খেলাধুলা শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, দলগত কাজ, নেতৃত্ব এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। প্রতিযোগিতায় জয়-পরাজয়ের অভিজ্ঞতা তাদের ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে পড়াশোনার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদন ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার সুযোগও তৈরি হয়।
এ ধরনের আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। প্রত্যন্ত গ্রাম, শহরের প্রান্তিক এলাকা কিংবা সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুরাও যদি সমানভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রতিভা বিকাশের পরিসর আরও বিস্তৃত হবে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আর্থিক সামর্থ্য, পারিবারিক পরিচয় কিংবা ভৌগোলিক অবস্থান যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। মেয়েদের অংশগ্রহণ, প্রতিবন্ধী শিশুদের উপযোগী সুযোগ এবং নিরাপদ প্রশিক্ষণ পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
এদিকে খুলনাকে ঘিরে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টিও নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের আয়োজনের সঙ্গে আলোচনায় এসেছে। খুলনা একসময় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিত একটি শহর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে ক্রীড়া কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, মানসম্মত মাঠ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রয়োজন রয়েছে। জেলা স্টেডিয়ামসহ স্থানীয় ক্রীড়া স্থাপনাগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের তরুণ খেলোয়াড়েরা উপকৃত হতে পারেন।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, এবারের আসরে ১০টি ইভেন্ট রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগের কথাও জানানো হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছর এক হাজার ইউনিয়নে মাঠ তৈরির কার্যক্রম বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নিয়মিত অনুশীলন ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য শিশু-কিশোরদের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তব অগ্রগতি, মাঠের ব্যবহারযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরকে সফল করতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক কার্যক্রম। প্রতিযোগিতার বাছাইপর্ব থেকে শুরু করে পরবর্তী ধাপগুলোতে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে খেলোয়াড় নির্বাচন করতে হবে। যারা প্রতিভার পরিচয় দেবে, তাদের জন্য পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষণ, পুষ্টি, চিকিৎসা সহায়তা এবং উন্নত পর্যায়ে খেলার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর খেলোয়াড়দের খোঁজখবর না রাখলে অনেক প্রতিভা আবারও হারিয়ে যেতে পারে।
খুলনায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো। এখন এই আয়োজনের বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিবন্ধিত বিপুলসংখ্যক শিশু-কিশোরের অংশগ্রহণকে কার্যকর প্রতিযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের সুযোগে রূপ দেওয়া। তৃণমূল থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের ধারাবাহিকভাবে পরিচর্যা করা গেলে ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার মতো নতুন প্রজন্ম তৈরি হতে পারে। সে লক্ষ্য অর্জনে প্রতিযোগিতার আয়োজনের পাশাপাশি মাঠ, প্রশিক্ষক, সুযোগ-সুবিধা ও নিয়মিত পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দেওয়াই হবে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।


