স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে আর রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর বক্তব্য, যারা মানুষের প্রাণহানি, গণহত্যা, জুলুম ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং পরবর্তী সময়ে নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চায়নি বা অনুশোচনা প্রকাশ করেনি, তাদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের সুযোগ দেশের মানুষ দেবে না। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসার ১০৪তম দুই দিনব্যাপী বার্ষিক মাহফিলের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবস্থান নিয়ে তাঁর সরকারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক অবস্থান নিয়েও বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ অতীতে যে ধরনের কর্মকাণ্ড করেছে, তার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া কিংবা অনুশোচনা প্রকাশের কোনো লক্ষণ তিনি দেখছেন না। তাঁর মতে, যারা মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, গণহত্যা চালিয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন করেছে, তাদের আবার রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, দেশের মানুষ আর সেই রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে যেতে চায় না।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় এবং নির্বাচনের আগে দ্বীন, দেশ ও জনগণের পক্ষে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিবাদী ভূমিকার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হেফাজতে ইসলামের আমির মাওলানা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী।
তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময়কাল তুলনা করেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ২৩ বছর লেগেছিল। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী, ইসলামবিদ্বেষী ও আলেমবিদ্বেষী সরকারের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করতে ১৬ থেকে ১৭ বছর সময় লেগেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ সময় আন্দোলনে প্রাণ হারানো আলেম-ওলামা ও ছাত্রসমাজের সদস্যদের অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনে শহীদ হওয়া অনেকের নাম এখনো সাধারণ মানুষের জানা নেই। অনেকের কবরের ঠিকানাও অজানা রয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্যে এসব মানুষের আত্মত্যাগের পাশাপাশি নিখোঁজ ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি বলেন, বহু মানুষের রক্ত ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশ একটি কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণহানির প্রসঙ্গ তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এ ছাড়া বিগত ১৬ থেকে ১৭ বছরে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রায় তিন হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। আল্লাহর রহমত ও মানুষের দোয়ায় তিনি বেঁচে আছেন বলেও মন্তব্য করেন।
এ সময় তিনি আরও দাবি করেন, বিগত সময়ে প্রায় সাত হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ হামলা-মামলার মাধ্যমে নিপীড়িত হয়েছেন। এসব অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন রাখেন, এত প্রাণহানি ও নির্যাতনের পরও দেশের মানুষ কি আবার সেই রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাবর্তন দেখতে চায়? একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আবারও ফ্যাসিবাদী শক্তির ফিরে আসার ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা নিয়েও বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের তৈরি পোশাক খাতে যারা অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের পেছনে ফ্যাসিবাদী শক্তির হাত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ঘটনার নাম উল্লেখ করেননি। ফলে তাঁর এই অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের তথ্য বা প্রমাণ রয়েছে, সে বিষয়ে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে তিনি ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক আদর্শের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, কিছু ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল ইসলামের নাম ব্যবহার করে রাজনীতি করলেও তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও দলীয় নীতিতে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতিফলন নেই। তিনি বলেন, নিজেদের ইসলামী দল হিসেবে পরিচয় দেওয়া কিছু রাজনৈতিক শক্তি তাদের দলীয় ম্যানিফেস্টো থেকে ‘আকিমুদ্দিন’ শব্দটি বাদ দিয়েছে বলে তাঁর দাবি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা কিংবা শরিয়াভিত্তিক আইন চালুর বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। বরং শরিয়াভিত্তিক শাসনের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। তবে কোন দলের কোন ইশতেহার বা দলিলের ভিত্তিতে তিনি এ বক্তব্য দিয়েছেন, তা অনুষ্ঠানে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি।
এর বিপরীতে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তাঁরা ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের রাজনৈতিক ধারায় ‘বিসমিল্লাহ’ সংযোজন, কোরআন তিলাওয়াত এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতির গুরুত্ব রয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই আদর্শের ভিত্তিতে দেশের সব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে তাঁদের।
জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে জনগণের মধ্যে ধর্ম, পরিচয় কিংবা অন্য কোনো কারণে বিভেদ তৈরি হওয়া উচিত নয়। সব জনগোষ্ঠীর মানুষের একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় রয়েছে এবং সেই পরিচয়ের ভিত্তিতেই ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। তাঁর মতে, ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করা দেশের জন্য ইতিবাচক নয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল ধর্মের নাম ব্যবহার করলেও তাদের কর্মকাণ্ডে ধর্মীয় মূল্যবোধের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না। এসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজে বিভাজন তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্বাধীনতার আগে ও পরে বিভ্রান্তিমূলক রাজনীতির মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগও তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর আশঙ্কা, একই ধরনের রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করলে দেশে আবারও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি মাহফিলের ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্বও অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে উঠে আসে। বাবুনগর মাদরাসার ১০৪তম বার্ষিক মাহফিলের সমাপনী দিনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত আলেম-ওলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের উপস্থিতি ছিল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাদরাসার পরিচালক ও হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুমাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া, জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার, রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। অতীতের সহিংসতা ও নির্যাতনের অভিযোগের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টিও এ আলোচনার সঙ্গে যুক্ত।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করতে পারে। তবে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, প্রমাণ এবং সাংবিধানিক কাঠামোর বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে অতীতের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ওপর বর্তায়।
বাবুনগর মাদরাসার মাহফিলে দেওয়া বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ একদিকে আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে রাজনীতি পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, অতীতের নির্যাতন ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে আর কোনোভাবেই বিভেদ ও অস্থিরতা ফিরে না আসে।


