দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়নে বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম তদারকি জোরদার, শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বয়স, মেধা ও শেখার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আরও বিজ্ঞানসম্মত, সহজবোধ্য ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কাজ চলছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে নতুন মনিটরিং নীতিমালা তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
বুধবার (৪ নভেম্বর) হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার এস এম ফয়সল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) স্কুল ফিডিং কর্মসূচি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি দেশের প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, শিক্ষার্থীদের পুষ্টি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে বিদ্যালয়গুলোর নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত হচ্ছে কি না, শিক্ষকরা যথাসময়ে শ্রেণিকক্ষে যাচ্ছেন কি না এবং নির্ধারিত পাঠ যথাযথভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না, এসব বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের সমস্যা সমাধানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নতুন মনিটরিং নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, চলতি মাসেই নতুন মনিটরিং নীতিমালাটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। নীতিমালাটি কার্যকর হলে বিদ্যালয় পর্যায়ে তদারকির ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন অনিয়ম ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার।
হবিগঞ্জ জেলার প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের মধ্যে হবিগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থান সর্বনিম্ন—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে জেলার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার মান আরও উন্নত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ জন্য বিদ্যালয়গুলোর বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি এবং পাঠদানের পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
মাধবপুরের এস এম ফয়সল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, বিদ্যালয়টিতে ৪০০-এর বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। তিনি কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ ঘুরে দেখেছেন এবং সেখানে মানসম্মত পাঠদান কার্যক্রম লক্ষ্য করেছেন। একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ শুধু অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিকতা, নিয়মিত পাঠদান এবং বিদ্যালয় পরিচালনার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপরও নির্ভরশীল। তাই ভালো উদাহরণগুলো চিহ্নিত করে দেশের অন্যান্য বিদ্যালয়েও সেগুলোর ইতিবাচক দিক অনুসরণ করার সুযোগ রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো দেশব্যাপী স্কুল ফিডিং কর্মসূচি। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা করা এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরিতে এ ধরনের কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকার ইতিমধ্যে দেশব্যাপী স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করেছে। আগামী বছরের মধ্যে এটি দেশের সব বিদ্যালয়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি মাধবপুর উপজেলায় ১৫০টির বেশি বিদ্যালয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের কর্মসূচির ইতিবাচক দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করে সরকারি উদ্যোগে সেগুলো অনুসরণের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোথায় কী ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ডব্লিউএফপির অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারলে সরকারি স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে অনেক শিক্ষার্থীর মনোযোগ ধরে রাখা, নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসা এবং শ্রেণিকক্ষের পাঠ বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। বিশেষ করে আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ভিত্তিক খাবার কর্মসূচি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তাই স্কুল ফিডিং কার্যক্রমকে শুধু খাবার বিতরণের কর্মসূচি হিসেবে না দেখে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সব বিদ্যালয়ে এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা গেলে প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, দেশের অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও শ্রেণিকক্ষের সংকট, কোথাও পুরোনো ভবনের কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশে পাঠগ্রহণের সুযোগ দিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন আধুনিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে মডেল স্কুল প্রকল্প, পিডিবি-৫ এবং জিপিএস প্রকল্পসহ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, আধুনিক ও কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা। প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রকল্পগুলোর মধ্যে দুটি শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে পিডিবি-৫ প্রকল্পটি ডিসেম্বরের মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ করলেই প্রাথমিক শিক্ষার সব সমস্যা সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং শিশুদের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি এসব মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ বাড়বে এবং পাঠদানের পরিবেশ আরও উন্নত হবে।
প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের বিষয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনার কথা জানান ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বয়স, মানসিক বিকাশ এবং শেখার উপযোগিতা বিবেচনায় নিয়ে আরও উন্নত ও বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কাজ চলছে। এ দায়িত্ব জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) দেওয়া হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় পড়াশোনার চাপ কমিয়ে বিষয়গুলো সহজবোধ্য করার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক শেখার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন শিক্ষাক্রমে বিদ্যালয়ের এক শিফট ও দুই শিফটের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সময়ের মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি হয়, তা দূর করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। কারণ, এক শিফট ও দুই শিফটে পরিচালিত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে সমান সময় পাঠগ্রহণের সুযোগ পায় না। ফলে শিক্ষার সুযোগ ও পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ব্যবধান তৈরি হতে পারে। এই বৈষম্য কমিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সমতাভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাকে আরও সহজবোধ্য করা, কার্যকর শিখনসামগ্রী তৈরি এবং নৈতিক শিক্ষা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের শুধু বইয়ের বিষয়বস্তু মুখস্থ করানোর পরিবর্তে চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, সামাজিক আচরণ ও নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও সহায়ক। তাই নতুন শিক্ষাক্রমে এসব বিষয়কে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম ফয়সল, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হেড অব প্রোগ্রাম জেসি উড, স্কুল ফিডিং প্রোগ্রামের হেড এমা লেফু, মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান, সহকারী পুলিশ সুপার মো. রাফিউর রহমানসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।
এস এম ফয়সল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী জগদীশপুর চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ ও শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
সামগ্রিকভাবে সরকারের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য প্রাথমিক শিক্ষাকে আরও মানসম্মত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তোলা। তবে পরিকল্পনাগুলোর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে সেগুলোর বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। শিক্ষক উপস্থিতি, নিরাপদ অবকাঠামো, পুষ্টি, মানসম্মত পাঠদান ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম—এই বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।


