প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে পুকুরে মাছ ধরা নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে হামলায় আফতাব উদ্দিন (২৪) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নিহতের চাচাতো ভাই জুয়েল আহমদ (২৮) কে আটক করেছে পুলিশ। হামলায় জাহাঙ্গীর আলম নামে আরও একজন আহত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) ভোর ৫টার দিকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আফতাব উদ্দিনের মৃত্যু হয়। এর আগে রোববার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১টার দিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার দুপরিরপাড় গ্রামে এ হামলার ঘটনা ঘটে। রাতের আঁধারে পুকুরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ একপর্যায়ে হামলায় রূপ নেয় বলে স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের বক্তব্যে জানা গেছে।
নিহত আফতাব উদ্দিন দুপরিরপাড় গ্রামের কালা মিয়ার ছেলে। স্বজন ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পুকুরের মালিকানা ও ভোগদখল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আফতাবের পরিবারের সঙ্গে তাঁর চাচা আব্দুল হালিমের পরিবারের বিরোধ চলছিল। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পুকুরের মালিকানা নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিরোধ ধীরে ধীরে উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠেছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে আফতাব উদ্দিন ও তাঁর সহযোগী জাহাঙ্গীর আলম ওই পুকুরে সেচ দিয়ে মাছ ধরছিলেন। এ সময় আফতাবের চাচাতো ভাইসহ কয়েকজন সেখানে উপস্থিত হন। তাঁদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। মাছ ধরা নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে আফতাব ও জাহাঙ্গীরের ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
হামলার ঘটনায় আফতাব গুরুতর আহত হন। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় স্থানীয়রা তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। পরে তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।
আফতাবের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দুপরিরপাড় এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। মাত্র ২৪ বছর বয়সে একটি পারিবারিক বিরোধের ঘটনায় তাঁর প্রাণ হারানোর বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বজনদের কাছে রাতের একটি সাধারণ বিরোধ কীভাবে এত বড় ঘটনায় পরিণত হলো, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এ ঘটনায় আহত জাহাঙ্গীর আলমও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর আঘাতের ধরন ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। হামলার সময় সেখানে আর কেউ আহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়েও পুলিশ তদন্ত করছে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উজমান গণি বলেন, পুকুর নিয়ে আফতাবের সঙ্গে তাঁর চাচাতো ভাইদের বিরোধ ছিল। ওই পুকুরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে রোববার রাতে আফতাবের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরে ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। আটক জুয়েল আহমদ নিহত আফতাবের চাচাতো ভাই। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলার প্রকৃত কারণ, ঘটনার সময় সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন এবং কার কী ধরনের ভূমিকা ছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র বা অন্যান্য আলামত সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজও আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে জমি, পুকুর, বসতভিটা কিংবা সম্পত্তির মালিকানা ও দখল নিয়ে পারিবারিক বিরোধ অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে এসব বিরোধে পারস্পরিক দূরত্ব বাড়তে পারে এবং ছোটখাটো বিষয়ও উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। কোম্পানীগঞ্জের এই ঘটনাতেও পুকুরের মালিকানা নিয়ে আগে থেকেই বিরোধ থাকার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে সেই বিরোধের বিস্তারিত ইতিহাস এবং হামলার আগে কোনো সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হবে।
আফতাব উদ্দিনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্যই শোকের ঘটনা নয়, বরং পারিবারিক বিরোধ কীভাবে সহিংস পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তারও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে সামনে এসেছে। একটি পুকুরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে রাতের বেলায় সংঘটিত হামলার পর একজন তরুণের মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ থাকায় ঘটনাটি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
এখন তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বেরিয়ে আসার অপেক্ষা। হামলার পেছনে তাৎক্ষণিক কারণ কী ছিল, পূর্বের বিরোধ কতটা ভূমিকা রেখেছে, হামলায় কতজন অংশ নিয়েছিলেন এবং প্রত্যেকের ভূমিকা কী—এসব প্রশ্নের উত্তর আইনি তদন্তেই নির্ধারিত হবে। আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং আহত জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিহত আফতাবের পরিবারের পক্ষ থেকেও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা রয়েছে। এদিকে এলাকায় যেন নতুন করে কোনো উত্তেজনা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জের এই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত আইনের মাধ্যমে বিরোধের নিষ্পত্তিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুকুরের মালিকানা কিংবা মাছ ধরার অধিকার নিয়ে যে বিরোধই থাকুক না কেন, তার পরিণতিতে একজন তরুণের জীবন হারানোয় একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন থমকে গেছে। তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়েই নিহত আফতাবের পরিবার ন্যায়বিচারের পথ দেখতে পারে।


