প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের জকিগঞ্জে জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়া ও টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ছেলের হামলায় পিয়ারা বেগম (৬৩) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর রোববার মধ্যরাতে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাঁর পরিবারের আরও চার সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। ঘটনার পর প্রধান অভিযুক্ত ছেলে সুমন আহমদকে (৩২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পিয়ারা বেগম জকিগঞ্জ পৌর এলাকার পঙ্গবট গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের স্ত্রী। পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে টাকা এবং বাড়ির জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন সুমন। এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমে সৎমাকে মারধর এবং পরদিন পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ।
ঘটনার পর সুমন আহমদকে তাঁর বসতঘর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রোববার তাঁকে জকিগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম সরকারের আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত শুক্রবার জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার দাবি এবং টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে সুমন তাঁর সৎমা কুটিনা বেগমকে (৪৫) লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। এতে কুটিনা বেগমের চোখে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
সৎমাকে ছেলের হামলা থেকে রক্ষা করতে পিয়ারা বেগম তাঁকে তাঁর অপর ছেলে শাহীন আহমদের ঘরে নিরাপদে রাখেন। কিন্তু এর পরদিন শনিবার রাতে আবারও পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে সুমন পরিবারের সদস্যদের কাছে টাকা দাবি করেন এবং জায়গা-সম্পত্তি তাঁর নামে লিখে দেওয়ার কথা বলেন। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তিনি লাঠি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে।
হামলায় পিয়ারা বেগম, তাঁর সৎমা কুটিনা বেগম, ছেলে শাহীন আহমদ (৩৮), শাহীন আহমদের স্ত্রী শাহানা বেগম (৩২) এবং তাঁদের আড়াই বছরের শিশুকন্যা ইসরাত জাহান গুরুতর আহত হয়। হামলার পর পরিবারের সদস্যদের চিৎকার ও পরিস্থিতি দেখে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসেন। পরে আহতদের উদ্ধার করে জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পিয়ারা বেগমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। শেষ পর্যন্ত রোববার মধ্যরাতে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর খবরে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের পরিবেশ নেমে আসে।
একই ঘটনায় আহত অন্য সদস্যদের অবস্থাও গুরুতর বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। মামলার বাদী শাহীন আহমদ জানান, হামলায় তাঁর স্ত্রী শাহানা বেগম ও মেয়ে ইসরাত জাহানের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁর সৎমা কুটিনা বেগমের চোখের আঘাতও গুরুতর। হামলায় তিনিও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন বলে জানান শাহীন।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সুমন কয়েক দিন ধরে তাঁদের কাছে টাকা দাবি করে আসছিলেন। একই সঙ্গে বাড়ির জায়গা ও সম্পত্তি তাঁর নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছিলেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত এবং মাদকের অর্থের জন্য পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ দিতেন। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
এ ঘটনায় শাহীন আহমদ বাদী হয়ে জকিগঞ্জ থানায় মামলা করেছেন। মামলায় সুমন আহমদ ও অপর ভাই শামীম আহমদ (৪৭)কে আসামি করা হয়েছে। পিয়ারা বেগমের মৃত্যুর পর মামলায় হত্যার অভিযোগে প্রযোজ্য দণ্ডবিধির ধারা সংযোজন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ছেলের হামলায় আহত পিয়ারা বেগম চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত সুমন আহমদকে তাঁর বসতঘর থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ওসি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে তদন্তে জানা গেছে, জায়গা-সম্পত্তি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য সুমন কয়েক দিন ধরে পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন। এ বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা।
একটি পরিবারের ভেতরের সম্পত্তি ও অর্থসংক্রান্ত বিরোধ কীভাবে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, জকিগঞ্জের এই ঘটনা তারই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে। যেখানে পারিবারিক সম্পর্কের নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের জায়গা হওয়ার কথা, সেখানে অভিযোগ অনুযায়ী লাঠির আঘাতে একই পরিবারের একাধিক সদস্য আহত হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন পরিবারেরই একজন মা।
পিয়ারা বেগমের ক্ষেত্রে ঘটনার শুরুটা হয়েছিল পরিবারের একজন সদস্যকে হামলা থেকে রক্ষা করার চেষ্টা দিয়ে। সৎমা কুটিনা বেগমকে প্রথম দফার হামলার পর নিরাপদে অন্য ছেলের ঘরে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরদিন রাতেই সেই ঘরও নিরাপদ থাকেনি। পরিবারের সদস্যদের ওপর দ্বিতীয় দফা হামলায় পিয়ারা বেগম নিজেও গুরুতর আহত হন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই পরিবারের একাধিক সদস্য গুরুতর আহত হওয়া এবং একজনের মৃত্যু পরিস্থিতিটিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। বিশেষ করে আড়াই বছরের একটি শিশুও হামলায় আহত হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এখন মামলার তদন্তে হামলার প্রকৃত কারণ, ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি, আসামিদের প্রত্যেকের ভূমিকা এবং পিয়ারা বেগমের মৃত্যুর সঙ্গে হামলার সরাসরি যোগসূত্রসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসা, তাঁদের জবানবন্দি এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পিয়ারা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায়ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা এবং এলাকায় যাতে নতুন করে কোনো উত্তেজনা তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর রাখছে পুলিশ।
একজন মায়ের মৃত্যু দিয়ে এই পারিবারিক বিরোধের সবচেয়ে করুণ পরিণতি ঘটেছে। অর্থ ও সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তার ক্ষতি শুধু একজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো পরিবারকে দীর্ঘস্থায়ী শোক, অনিশ্চয়তা ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ঠেলে দেয়। জকিগঞ্জের পঙ্গবট গ্রামের এই ঘটনাতেও পিয়ারা বেগমের মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আরও নির্মমভাবে সামনে এনেছে।
পুলিশের তদন্ত ও আদালতের আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এখন ঘটনার দায় ও অপরাধের বিষয়টি নির্ধারিত হবে। তবে পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা, পিয়ারা বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


