প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জীবিকার তাগিদে প্রায় ছয় বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে পাড়ি জমিয়েছিলেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার কালিশীরি গ্রামের যুবক খলিলুর রহমান রিফাত (২৭)। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে মাসকাট শহরের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করছিলেন তিনি। নিয়মিত মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন, পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতেন। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও মায়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল নিত্যদিনের। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই যোগাযোগ থেমে গেছে। টানা ১৮ দিন ধরে কোনো সন্ধান নেই রিফাতের।
ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হওয়ার পর থেকে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ। প্রথমদিকে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টিকে স্বাভাবিক নেটওয়ার্ক সমস্যা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু এক দিন, দুই দিন করে যখন দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায় এবং রিফাতের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না, তখন পরিবারের উদ্বেগ ধীরে ধীরে আতঙ্কে রূপ নেয়। এখন ছেলের অপেক্ষায় হবিগঞ্জের বাড়িতে দিন কাটছে তাঁর মা সাফিয়া আক্তারের। ছেলের কোনো খবর না পেয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।
নিখোঁজ রিফাত চুনারুঘাট উপজেলার কালিশীরি গ্রামের আজিজুল হকের দ্বিতীয় সন্তান। প্রায় ছয় বছর ধরে তিনি ওমানের মাসকাট শহরে বসবাস করছিলেন। সেখানে একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করে নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহে সহযোগিতা করতেন। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার কারণে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের অভ্যাসও ছিল নিয়মিত। বিশেষ করে মায়ের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই ফোনে কথা বলতেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৮ দিন আগে মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় রিফাতের। এরপর থেকেই তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম কয়েক দিন পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করেন। তাঁরা আশা করেছিলেন, হয়তো মোবাইল ফোনের সমস্যা কিংবা নেটওয়ার্ক জটিলতার কারণে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, ততই পরিবারের উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে।
একপর্যায়ে ওমানে থাকা রিফাতের সহকর্মী, রুমমেট এবং পরিচিত প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁর কর্মস্থল সম্পর্কেও খোঁজ নেওয়া হয়। কিন্তু কেউই রিফাতের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এমনকি মাসকাটের যে রেস্টুরেন্টে তিনি কাজ করতেন, সেই প্রতিষ্ঠানের বিদেশি মালিকের কাছ থেকেও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পরিবার।
একজন প্রবাসী কর্মীর এভাবে হঠাৎ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ আরও বেড়েছে পরিবারের। রিফাতের সঙ্গে শেষ যোগাযোগের পর থেকে তাঁর বর্তমান অবস্থান, তিনি কোথায় আছেন কিংবা কী পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে জানতে পারছে না পরিবার। ফলে প্রতিটি দিন তাঁদের কাছে অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে কাটছে।
রিফাতের মা সাফিয়া আক্তার ছেলের অপেক্ষায় বারবার ভেঙে পড়ছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তাঁর ছেলে প্রতিদিন ফোন করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু ১৮ দিন ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। ছেলে জীবিত আছেন কি না, কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন—কিছুই জানেন না তিনি। ছেলেকে দ্রুত খুঁজে বের করতে সরকার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
সাফিয়া আক্তারের এই অপেক্ষার মধ্যে একজন মায়ের স্বাভাবিক উদ্বেগের সঙ্গে মিশে আছে গভীর অনিশ্চয়তা। বিদেশের মাটিতে থাকা সন্তানের সঙ্গে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে পরিবারের পক্ষে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। রিফাতের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ ১৮ দিন কোনো যোগাযোগ না থাকায় সেই উদ্বেগ এখন চরমে পৌঁছেছে।
ছেলের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন বাবা আজিজুল হক। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রিফাতের সন্ধান পেতে তাঁরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ওমানে থাকা পরিচিত বাংলাদেশি ও প্রবাসীদের কাছ থেকেও সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে ওমানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের জরুরি সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং চুনারুঘাট উপজেলা প্রশাসনেরও হস্তক্ষেপ কামনা করেছে পরিবার। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সন্ধান না পাওয়ায় রিফাতকে খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁর স্বজনরা।
প্রবাসে থাকা একজন বাংলাদেশি নাগরিকের সঙ্গে এভাবে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রিফাতের পরিবারও আশা করছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ওমানে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন এবং তাঁর সন্ধানে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন।
রিফাতের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে কোনো ধরনের অনুমান বা গুজবের ওপর নির্ভর না করে তাঁর প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত করাই পরিবারের প্রধান লক্ষ্য। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার কারণও এখনো স্পষ্ট নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার।
কালিশীরি গ্রামের বাড়িতে এখন রিফাতের স্বাভাবিক উপস্থিতির বদলে অপেক্ষার নীরবতা। যে ফোনটি প্রতিদিন বেজে উঠত, সেটি ১৮ দিন ধরে নীরব। মায়ের কাছে সন্তানের একটি ফোনকল এখন হয়ে উঠেছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বিষয়। পরিবারের সদস্যরা প্রত্যাশা করছেন, যেকোনো মুহূর্তে হয়তো রিফাতের খবর পাওয়া যাবে এবং দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে।
রিফাতের পরিবারের পক্ষ থেকে ওমানে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের প্রতিও সহযোগিতার আবেদন জানানো হয়েছে। কেউ যদি মাসকাটে বা ওমানের অন্য কোনো এলাকায় খলিলুর রহমান রিফাতকে দেখে থাকেন কিংবা তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য জেনে থাকেন, তাহলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ করা হয়েছে।
পরিবার জানিয়েছে, রিফাতের সন্ধান পাওয়া গেলে ০১৯২৮২৯০৫৫৪ নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তথ্য জানানো যাবে। একটি পরিবারের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিশ্চিত তথ্য—রিফাত কোথায় আছেন, কেমন আছেন এবং কীভাবে তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব।
ছয় বছর ধরে প্রবাসে থেকে পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন রিফাত। জীবিকার প্রয়োজনে হাজার মাইল দূরে থাকা এই তরুণের হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া তাঁর পরিবারকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। মা-বাবার কাছে এখন অর্থনৈতিক সহায়তা কিংবা প্রবাসজীবনের কোনো সাফল্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সন্তানের নিরাপদে ফিরে আসার খবর।
রিফাতের পরিবার তাই সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, ওমানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করা হবে এবং দ্রুত রিফাতের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হবে। দীর্ঘ ১৮ দিনের অপেক্ষার পর একটি ফোনকল, একটি নিশ্চিত খবর কিংবা প্রিয়জনের ফিরে আসার সংবাদই এখন পরিবারটির সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।


