ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর পরিকল্পনা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে আরও সমন্বিত করার লক্ষ্যে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ভাষণে তিনি সামাজিক সুরক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল যেন সমাজের প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যে সরকার শুধু রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যে গণতন্ত্রকে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মানুষের অংশগ্রহণ ও সুযোগ বাড়াতে চায়। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের সহায়তায় বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এই সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব পৃথক কার্ড ও সহায়তা ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতে সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন খাতের সামাজিক সহায়তা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে ফ্যামিলি কার্ডের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরিবারের নারী প্রধানের নামে এই কার্ড দেওয়ার উদ্যোগকে তিনি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষণে নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়ও গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের কথা জানান তিনি।

জাতিসংঘের মঞ্চে সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ বিশ্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। বিশ্ব ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুবিধা এখনো বিশ্বের সব মানুষ ও দেশের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

বাংলাদেশের বড় তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতাকে সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বর্তমানের ডিজিটাল বৈষম্য ভবিষ্যতে যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন বৈষম্যে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠী যেন পিছিয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের সুফল যেন বিশ্বজুড়ে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, সে জন্য জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটও বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে। দীর্ঘস্থায়ী এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর স্থায়ী সমাধানও সেখানে করতে হবে। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোকে তিনি সংকটের সমাধানের পথ হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন সম্ভব না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়েও বাংলাদেশের উদ্বেগ জাতিসংঘের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে তুলনামূলকভাবে সামান্য অবদান রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বন্যা, খরা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আগামী কপ-৩১ সম্মেলন থেকে আরও শক্তিশালী বৈশ্বিক পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দেশের পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচির কথা জানান। বন্যা ও খরার প্রভাব কমাতে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি নেওয়ার কথাও তিনি ভাষণে উল্লেখ করেন।

এর আগে চলতি বছরের জুলাই মাসেও প্রধানমন্ত্রী দেশে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। একই সময়ে নদী ও খাল রক্ষা, পানি সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ফলে জাতিসংঘের ভাষণে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে উল্লেখ করা কর্মসূচিগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশনীতি ও জলবায়ু অভিযোজন উদ্যোগের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

জাতিসংঘের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির উল্লেখযোগ্য অংশ ‘কাউকে পিছনে না রাখা’ নীতির সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শহর ও গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য কমানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যও তিনি তুলে ধরেন।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়াকেও ভাষণে গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষায় ব্যয় ধীরে ধীরে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলের পোশাক, ব্যাগ ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা এবং শিক্ষাক্রমে খেলাধুলাকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের কথা জানান।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া টেকসই করতে নিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All’। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তি, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, মানবিক সংকট, প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার এবং জলবায়ু ঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

সব মিলিয়ে জাতিসংঘে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে সমন্বিত করার পরিকল্পনা হিসেবে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন খাতভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় নতুন একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে। তবে এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি, আওতাভুক্ত কর্মসূচি, সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হওয়ার বিষয়।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

জাতিসংঘে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলে জাইমা রহমান

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শনিবার থেকে শুরু হামের দ্বিতীয় বিশেষ টিকাদান

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শনিবার সিলেট সফরে আসছেন বাণিজ্যমন্ত্রী

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আরসিইপিতে বাংলাদেশের যোগদানের প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নিজ ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় এনসিপি নেতার মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

জাতিসংঘে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলে জাইমা রহমান

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শনিবার থেকে শুরু হামের দ্বিতীয় বিশেষ টিকাদান

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শনিবার সিলেট সফরে আসছেন বাণিজ্যমন্ত্রী

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আরসিইপিতে বাংলাদেশের যোগদানের প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নিজ ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় এনসিপি নেতার মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইউএনজিএতে টানা দ্বিতীয়বার অনুপস্থিত মোদি

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ক্লাসিক কলেজে নবীনদের ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হবিগঞ্জে ইয়াবা দিয়ে বাবা-মেয়েসহ ৩ জনকে ফাঁসানোর অভিযোগ

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ