পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। দেশের প্রখ্যাত চারুশিল্পী, শিল্পশিক্ষক, নাট্যনির্দেশক, গবেষক এবং আধুনিক পাপেট বা পুতুলনাট্য শিল্পের প্রধান রূপকার মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার (২৯ জুন) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে কিংবদন্তি এই শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষার্থী এবং অসংখ্য ভক্তের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে। দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে তিনি চিত্রকলা, টেলিভিশন, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, পাপেট শিল্প এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে অবদান রেখেছেন, তা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন তাঁর ভাগ্নি ও বিশিষ্ট অভিনেত্রী নিমা রহমান। তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে মরদেহ তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে নেওয়া হবে। পরে পরিবারের সদস্য, সহকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে দাফন এবং শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।

পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতার পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। চিকিৎসার একপর্যায়ে তাঁর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে পরে আবারও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সোমবার সকালে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন যশোর জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। বর্তমানে এলাকাটি মাগুরা জেলার অন্তর্ভুক্ত। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠার সুযোগ পান তিনি। পারিবারিক ঐতিহ্য তাঁর সৃজনশীল মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষাজীবনে তিনি চিত্রকলার প্রতি গভীর আগ্রহ দেখান। কলকাতা সরকারি চারু ও কারুকলা কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ চিত্রকলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে তিনি চারুশিল্পের বিকাশে আত্মনিয়োগ করেন এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য হয়ে ওঠেন এক অনুপ্রেরণার নাম।

মুস্তাফা মনোয়ারকে বাংলাদেশে আধুনিক পাপেট বা পুতুলনাট্য শিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি শুধু পুতুলনাচকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সচেতনতার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত তাঁর পাপেট অনুষ্ঠানগুলো বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। আশির দশকের জনপ্রিয় পাপেট শো ‘মনের কথা’ এবং এর চরিত্র ‘বাঘা’ ও ‘ভুতু’ বহু প্রজন্মের দর্শকের মনে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। শিশুদের কল্পনাশক্তি, মানবিক মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতা বিকাশে এসব অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শিল্পের পাশাপাশি মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন একজন সাহসী সাংস্কৃতিক কর্মী। ভাষা আন্দোলনের সময় নিজের আঁকা ছবি ও প্রতিবাদী পোস্টার নিয়ে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। নারায়ণগঞ্জ শহরের দেয়ালে এসব পোস্টার লাগানোর কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।

১৯৬৪ সালে পাকিস্তান টেলিভিশন ঢাকায় যোগ দেওয়ার পর তিনি বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও বাঙালি সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী উত্তাল সময়ে তাঁর সাংস্কৃতিক অবস্থান ছিল সাহসী ও দৃঢ়।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবসে টেলিভিশনের সম্প্রচারে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা না দেখিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করার ঘটনাটিও তাঁর সাহসী ভূমিকার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শরণার্থী শিবিরে শিশুদের মানসিক কষ্ট দূর করতে তিনি পাপেট শোর আয়োজন করেছিলেন। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে শিশুদের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে তাঁর এই উদ্যোগ ছিল মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

দীর্ঘ কর্মজীবনে মুস্তাফা মনোয়ার একাধারে শিল্পী, শিক্ষক, সংগঠক ও গবেষকের ভূমিকা পালন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন অসংখ্য তরুণ শিল্পী, যারা পরবর্তীতে দেশের শিল্পাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে তাঁকে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সম্মাননা ও স্বীকৃতি লাভ করেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পচর্চার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক তৈরি করা। তাঁর কাজের মধ্যে ছিল সহজ-সরল ভাষায় গভীর মানবিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা। শিশুদের জন্য তৈরি পাপেট অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে তাঁর চিত্রকর্ম—সবখানেই ছিল সৃজনশীলতা, মমতা ও দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা মনে করেন, মুস্তাফা মনোয়ার শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর হাতে গড়ে উঠেছে বহু শিল্পী, তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতা বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।

তাঁর প্রয়াণে দেশের শিল্পাঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তাঁর সৃষ্টি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দর্শন আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে। বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে মুস্তাফা মনোয়ার চিরকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

মৌলভীবাজারে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের ৭১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নতুন মুখ ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নতুন মুখ ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাতাসের মাঝে গান শোনা নিয়ে প্রশ্ন ববি হাজ্জাজের

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ আগুনে ৬ বাংলাদেশি নিহত

প্রকাশ: ২৮ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনে কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত: সিইসি

প্রকাশ:২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ