বকেয়া বেতনের দাবিতে হবিগঞ্জে চা শ্রমিকদের কর্মবিরতি

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

হবিগঞ্জের চা বাগানগুলোতে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বকেয়া বেতন, রেশন, পূজার উৎসব বোনাস, চিকিৎসা সুবিধা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ সাত দফা দাবিতে চারটি চা বাগানের শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। সোমবার সকাল থেকে চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি, লালচান ও মৃতিঙ্গা চা বাগান এবং মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া চা বাগানে এই কর্মসূচি শুরু হয়। কর্মবিরতির কারণে বাগানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে।

সকালে বাগানের শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে নিজ নিজ এলাকার নাট্য মন্দির ও নির্ধারিত স্থানে অবস্থান নেন। অনেক শ্রমিককে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদে অংশ নিতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে দাবি-দাওয়া উপেক্ষিত হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে এই কঠোর কর্মসূচিতে গেছেন বলে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।

দেউন্দি চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি আপন সাঁওতাল বলেন, দেউন্দি কোম্পানির অধীনে পরিচালিত চারটি বাগানের শ্রমিকরা বছরের পর বছর ধরে নানা সমস্যার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। বেতন অনিয়মিত হওয়া, রেশন সংকট, আবাসনের দুরবস্থা এবং চিকিৎসাসেবার অভাব তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২২ সাল থেকে মালিকপক্ষ বারবার সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

শ্রমিকদের দাবি, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তারা নিয়মিত সাপ্তাহিক তলবি বা বেতন পাচ্ছেন না। এতে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক ও তাদের পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকে বাজারে বাকিতে চলছেন, আবার কেউ কেউ সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ঈদ ও পূজার মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসব সামনে থাকলেও শ্রমিকদের মধ্যে কোনো স্বস্তি নেই। বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

চা শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা শুধু বকেয়া বেতন নয়, বর্ষা মৌসুমের আগে জরাজীর্ণ শ্রমিক লাইনের ঘর সংস্কার, শ্রম আইন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, নিয়মিত রেশন প্রদান এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ পরিশোধের দাবিও জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে।

এদিকে গত ৬ মে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উদ্যোগে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে দ্রুত শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিকদের অভিযোগ, বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মালিকপক্ষ কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি। ফলে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

দেউন্দি চা বাগানের ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন অবশ্য শ্রমিকদের আন্দোলন ও দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে আইনগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কোনো আবেদন পেয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর দেননি তিনি।

চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও চা শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি জীবনযাপন করছেন। দৈনিক মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আবাসনসহ মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাব নিয়ে বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেছেন তারা। বিশেষ করে ২০২২ সালে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা শ্রমিকদের টানা আন্দোলন দেশজুড়ে আলোচনায় আসে।

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, চা শিল্প দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী খাত হলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। শ্রমিকদের দাবি ও মালিকপক্ষের সক্ষমতার মধ্যে দীর্ঘদিনের দূরত্ব থেকেই বারবার এই ধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। সময়মতো বেতন ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, তারা বছরের পর বছর একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। চা বাগানের শ্রমিক লাইনের অনেক ঘর জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে পানি পড়ে বসবাস করা কঠিন হয়ে যায়। চিকিৎসা ব্যবস্থাও অপ্রতুল। অসুস্থ হলে অনেক সময় শ্রমিকদের নিজ খরচে বাইরে চিকিৎসা নিতে হয়, যা তাদের পক্ষে বহন করা কষ্টকর।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, কর্মবিরতির কারণে চা পাতা সংগ্রহ ও কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। যদি দ্রুত সমস্যার সমাধান না হয়, তাহলে উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এতে চা শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে পুরো এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা আন্দোলন করতে চান না, কিন্তু দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তা তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। অনেকে আশা করছেন, প্রশাসন ও শ্রম দপ্তর দ্রুত হস্তক্ষেপ করে সমস্যার সমাধান করবে।

শ্রম বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আশ্বাস দিয়ে চা শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান হবে না। বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ, মালিকপক্ষের জবাবদিহিতা এবং শ্রম আইন কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমেই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। একইসঙ্গে শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করাও জরুরি।

হবিগঞ্জের চারটি চা বাগানে শুরু হওয়া এই কর্মবিরতি এখন শুধু শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলন নয়; বরং দেশের চা শিল্পে দীর্ঘদিনের সংকট ও অবহেলার প্রতিচ্ছবিও হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব শ্রমিক পরিবার থেকে শুরু করে পুরো শিল্পখাতেই পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

মৌলভীবাজারে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের ৭১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নতুন মুখ ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নতুন মুখ ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাতাসের মাঝে গান শোনা নিয়ে প্রশ্ন ববি হাজ্জাজের

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ আগুনে ৬ বাংলাদেশি নিহত

প্রকাশ: ২৮ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনে কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত: সিইসি

প্রকাশ:২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ