সুনামগঞ্জে দালালের ফাঁদে প্রবাসের স্বপ্ন ভেঙে নিঃস্ব এক পরিবার

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় প্রবাসে যাওয়ার স্বপ্ন এখন অনেক পরিবারের কাছে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে একটি দালাল চক্র একের পর এক তরুণকে প্রতারণার জালে ফাঁসিয়ে সর্বস্ব হাতিয়ে নিচ্ছে। স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমানোর আশায় জমিজমা, বসতভিটা বিক্রি করে দেওয়া মানুষগুলো এখন নিঃস্ব, ঋণগ্রস্ত এবং অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন।

অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেদের বৈধ ট্রাভেল এজেন্সি বা বিদেশগামী কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে পরিচয় দিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করে। এরপর মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ভুয়া ভিসা, টিকিট ও কাগজপত্র দিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেয়।

জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর শাহশারপাড়া ইউনিয়ন, যা প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত, সেখানে এই প্রতারণার ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে। এই অঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারেই কেউ না কেউ বিদেশে অবস্থান করছেন। ফলে এখানকার তরুণদের মধ্যেও বিদেশ যাওয়ার প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই আগ্রহকেই পুঁজি করে দালাল চক্র তাদের ফাঁদ বিস্তার করেছে।

নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক কামরুল মিয়ার জীবনকাহিনি এই প্রতারণার একটি করুণ চিত্র তুলে ধরে। তিন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন তিনি। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন তাকে দালালদের সংস্পর্শে নিয়ে আসে। স্থানীয় তানভীর নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে শ্রম ভিসায় যাওয়ার প্রলোভন পান কামরুল। চুক্তি হয় ২৫ লাখ টাকায়।

এই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কামরুলকে নিজের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে হয়েছে। বসতভিটাসহ জমিজমা বিক্রি করে তিনি দালালের হাতে তুলে দেন ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে কিছু টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে এবং বাকিটা নগদে প্রদান করা হয়। টাকা নেওয়ার পর দালাল তানভীর খান তাকে ভিসা, বিমান টিকিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করেন।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্ধারিত দিনে বিমানবন্দরে পৌঁছালে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, তার সব কাগজপত্রই ভুয়া। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে তার প্রবাসযাত্রার স্বপ্ন। এরপর থেকে দালাল তানভীরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাননি তিনি।

কামরুল মিয়া বলেন, তার পরিবার এখন নিঃস্ব। তিনি জানান, দালালের প্রলোভনে পড়ে সব হারিয়েছেন তিনি। বর্তমানে ঋণের চাপে পরিবার নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তিনি আদালতে মামলা করেছেন এবং তার কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত চান।

কামরুলের স্ত্রী রচনা বেগমের কণ্ঠেও একই হতাশা। তিনি জানান, স্বামীর বিদেশ যাওয়ার আশায় বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এখন সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত চাপে থাকতে হচ্ছে। পাওনাদারদের চাপ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় তাদের দিন কাটছে চরম দুর্ভোগে।

কামরুলের মতো একই প্রতারণার শিকার হয়েছেন আরও অনেকেই। সৈয়দপুর গ্রামের সিরাজ আলী জানান, তার ছেলের জন্য বিদেশ যাওয়ার ব্যবস্থা করার নামে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তাকেও জমিজমা বিক্রি করতে হয়েছে। এখন তিনি নিঃস্ব এবং ঋণের বোঝা নিয়ে অন্যের বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তানভীর খান, তার সহযোগী মুহিব উদ্দিন খান ও মালেক খানসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। তারা সিলেট শহরে বেনামী ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা চালাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তারা নিজেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দমন করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ করে আসলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। স্থানীয় এক সমাজসেবী আব্দুল গফ্ফার বলেন, বহুবার সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও দালালরা তা মানেনি। তিনি দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

অভিযুক্ত তানভীর খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো মামলা করার হুমকি দেন।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। যেসব মামলা হয়েছে সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই ঘটনাগুলো শুধু কিছু ব্যক্তির প্রতারণার চিত্র নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন। উন্নত জীবনের আশায় বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা এবং সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দালালদের প্রতারণা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে এমন ট্র্যাজেডি।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের প্রতারণা রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং কোনো ধরনের প্রলোভনে না পড়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, সুনামগঞ্জের এই ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে কীভাবে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা না গেলে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

মৌলভীবাজারে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের ৭১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নতুন মুখ ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নতুন মুখ ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাতাসের মাঝে গান শোনা নিয়ে প্রশ্ন ববি হাজ্জাজের

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ আগুনে ৬ বাংলাদেশি নিহত

প্রকাশ: ২৮ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনে কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত: সিইসি

প্রকাশ:২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ