কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বড় ধরনের ধস নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে। দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয়ের পর প্রযুক্তি খাতের নীতিগত পরিবর্তনের আশঙ্কা এবং তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে সম্ভাব্য বাধার উদ্বেগে বৃহস্পতিবার এক দিনেই মার্কিন শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন কমেছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার। এই দরপতনের অভিঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাজারের এই অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন, চিপ উৎপাদন এবং তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা গেছে। প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর দরপতন সামগ্রিক বাজার সূচকগুলোকে নিচের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এক দিনের ব্যবধানে বাজারের এমন বড় পরিবর্তন বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
বাজার মূলধন কমে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে হলে শেয়ারবাজারের হিসাবটি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বাজার মূলধন বলতে কোনো কোম্পানি বা সামগ্রিক বাজারে তালিকাভুক্ত শেয়ারগুলোর মোট বাজারমূল্যকে বোঝায়। শেয়ারের দাম কমলে সেই হিসাবেও বড় অঙ্কের পতন ঘটে। ফলে এক দিনে আড়াই লাখ কোটি ডলার বাজারমূল্য কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে সমপরিমাণ নগদ অর্থ সরাসরি বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে; বরং শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য ওই পরিমাণ কমেছে।
গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর প্রধান শেয়ারসূচক নাসডাক কমেছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। গত ৬ অক্টোবর সূচকটি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। সেই অবস্থানের তুলনায় সূচকটির পতন প্রায় ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে বৃহস্পতিবারের আগে নাসডাকের এত বড় এক দিনের দরপতন দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু নাসডাক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধান সূচকেও বড় পতন হয়েছে। ডাও জোনস সূচক বৃহস্পতিবার ১ হাজার ৮৩৩ পয়েন্ট কমেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং ডাও জোনস—দুটি সূচকই ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর এক দিনে এত বড় পতনের মুখে পড়েনি। প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলোকে নিয়ে গঠিত নাসডাক-১০০ সূচক কমেছে ৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০২০ সালের মার্চে করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর থেকে এক দিনে এই সূচকের এত বড় পতন আর দেখা যায়নি।
বাজারের এই আকস্মিক পরিবর্তনের আগে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বুধবার দেশটির শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গিয়েছিল। সেদিন ডাও জোনস সূচক বেড়েছিল ১ হাজার ৫৬৯ পয়েন্ট এবং নাসডাকের দর বেড়েছিল ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। কিন্তু পরদিনই বাজারের চিত্র পাল্টে যায়। আগের দিনের উত্থানের পর বৃহস্পতিবারের বড় পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের গভীরতা প্রকাশ করেছে।
এই দরপতনের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনাহোসের জয়। এআই প্রযুক্তির অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে টেক্সাস গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গুগল, মেটা, ওরাকল ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান সেখানে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। এসব তথ্যকেন্দ্র এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন, তথ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় জিনা হিনাহোসে অঙ্গরাজ্যে সাময়িকভাবে নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পাশাপাশি এই খাতে বিনিয়োগকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দেওয়া কিছু করছাড় প্রত্যাহারের কথাও বলেছিলেন তিনি। নির্বাচনে তাঁর জয়কে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের একাংশের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, টেক্সাসে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাধার মুখে পড়তে পারে। এতে এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের গতি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন।
তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোই জড়িত নয়। এ ধরনের প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ সেমিকন্ডাক্টর চিপ, সার্ভার, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়। ফলে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ কমে গেলে এর প্রভাব চিপ নির্মাতা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়ও পড়তে পারে। বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য এই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিক্রি করতে শুরু করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম কমেছে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। এআই প্রযুক্তির প্রসারে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপের চাহিদা বাড়ায় প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এআই খাতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এনভিডিয়ার শেয়ারেও বড় চাপ দেখা গেছে। একই সঙ্গে চিপ নির্মাতা কোম্পানিগুলোর একটি সূচক কমেছে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। প্রায় সাড়ে ছয় বছরের মধ্যে এক দিনে এই সূচকের এত বড় পতন হয়নি।
প্রযুক্তি খাতের বাইরে গাড়ি ও মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বড় দরপতন দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার টেসলার শেয়ারের দাম কমেছে ১১ শতাংশ। তাঁর মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম কমেছে ৯ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের দরপতনও প্রযুক্তি খাতকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এশিয়ার বাজারেও যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার লেনদেন শুরু হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক কেওএসপিআই প্রায় ৯ শতাংশ কমে যায়। আকস্মিক এই দরপতনের কারণে দেশটির প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন ২০ মিনিটের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বড় দরপতনের সময় বাজারে আতঙ্কজনিত বিক্রি ঠেকানো এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সামাল দিতে এ ধরনের সাময়িক বিরতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বের পুঁজিবাজার এখন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন তাই অন্য দেশের বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশের বাজারে প্রযুক্তি খাতের কোম্পানি, চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কিংবা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসা রয়েছে, সেসব বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিরতার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে প্রতিটি দেশের বাজারে দরপতনের কারণ ও মাত্রা আলাদা হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কি সত্যিই কমে যাবে, নাকি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে ঘিরে তৈরি হওয়া আশঙ্কাই সাময়িকভাবে বাজারকে অস্থির করেছে। তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা কিংবা করছাড় প্রত্যাহারের মতো নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবে গৃহীত সরকারি নীতির মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নীতিগত সিদ্ধান্তও বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এআই প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিপুল বিনিয়োগ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য চিপ, তথ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর প্রয়োজন বাড়ছে। কিন্তু বড় বিনিয়োগের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। কোনো অঞ্চলে নীতিগত পরিবর্তন, নির্মাণসংক্রান্ত বিধিনিষেধ কিংবা করব্যবস্থার পরিবর্তনের আশঙ্কা দেখা দিলেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ আয় ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। বৃহস্পতিবারের দরপতন সেই উদ্বেগেরই বড় প্রতিফলন।
এক দিনের বাজার পতন দিয়ে এআই শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে আড়াই লাখ কোটি ডলারের বাজারমূল্য কমে যাওয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় লেনদেন সাময়িক বন্ধের ঘটনা দেখিয়েছে, প্রযুক্তি খাতের নীতিগত পরিবর্তনের আশঙ্কাও বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিবেশে কতটা বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের নীতি এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ পরিকল্পনার দিকে তাই বিনিয়োগকারীদের বিশেষ নজর থাকবে।

