হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসনের অভিযানের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। পরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত মেশিন ও পাইপ ধ্বংস করা হয়। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উপজেলার ৫ নম্বর শানখলা ইউনিয়নের পানছড়ি এলাকায় এ অভিযান পরিচালিত হয়।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চুনারুঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ তৌফিক আনোয়ারের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে চুনারুঘাট থানা-পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ এবং অনুমোদনহীনভাবে বালু উত্তোলন প্রতিরোধের লক্ষ্যে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
অভিযান চলাকালে প্রশাসনের উপস্থিতি বুঝতে পেরে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা দ্রুত ঘটনাস্থল ছেড়ে বনের ভেতরে পালিয়ে যান। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে অবৈধ বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন মেশিন ও পাইপ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিনষ্ট করা হয়। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ড পরিবেশ, জনপদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অনুমোদনহীনভাবে যন্ত্রের সাহায্যে বালু উত্তোলন করা হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মাটি ও ভূমির স্বাভাবিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নদী, ছড়া কিংবা প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে তীরভাঙন, ভূমিক্ষয় এবং আশপাশের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এ কারণে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন, নির্ধারিত স্থান ও প্রচলিত আইন মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চুনারুঘাটের পানছড়ি এলাকায় প্রশাসনের এই অভিযান অবৈধভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতার একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুধু অভিযান পরিচালনা কিংবা ব্যবহৃত সরঞ্জাম ধ্বংস করেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। নিয়মিত নজরদারি, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
এদিকে মঙ্গলবারের অভিযানে শুধু অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধের কার্যক্রমই পরিচালিত হয়নি, একই সঙ্গে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত একটি কবরস্থানের সীমানা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রশাসন কবরস্থানটির সীমানা নির্ধারণসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ সময় সংশ্লিষ্ট বিরোধীয় পক্ষগুলোর মধ্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চুনারুঘাটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ তৌফিক আনোয়ার জানান, একই অভিযানের অংশ হিসেবে আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত কবরস্থানের সীমানা চিহ্নিতকরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় বিরোধীয় পক্ষসমূহকে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কবরস্থান একটি এলাকার মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় সম্পদ। বিশেষ করে সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত কবরস্থানের জমি সংরক্ষণ এবং সীমানা নিয়ে বিরোধ নিরসন স্থানীয় পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জমির সীমানা নিয়ে মতবিরোধ দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা একপর্যায়ে সামাজিক উত্তেজনা কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। তাই আদালতের নির্দেশনা অনুসারে প্রশাসনের মাধ্যমে সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে শান্ত থাকার নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ।
সরকারি জমি ও সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত। এসব সম্পত্তি যেন অবৈধ দখল, ব্যবহার কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। একইভাবে সরকারি কবরস্থানসহ জনসাধারণের ব্যবহারযোগ্য সম্পদ সংরক্ষণে প্রশাসনিক উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ তৌফিক আনোয়ার আরও জানান, সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট এলাকায় সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ ব্যবহার বন্ধে প্রশাসন নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করছে।
চুনারুঘাটের পানছড়ি এলাকায় পরিচালিত তিন ঘণ্টার এই অভিযানে অবৈধ বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম ধ্বংস এবং সরকারি কবরস্থানের সীমানা চিহ্নিতকরণ—দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একদিকে প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন আবার শুরু হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও প্রশাসনের ধারাবাহিক নজরদারিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও সরকারি সম্পত্তি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয় নয়; এগুলো জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই চুনারুঘাটে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সরকারি কবরস্থানসহ অন্যান্য সম্পত্তি সংরক্ষণের উদ্যোগও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এতে স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা, সরকারি সম্পদের সুরক্ষা এবং এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।


