প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালি থেকে আতঙ্কের এক রোমাঞ্চকর বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রায় ৩ হাজার পর্যটক যখন পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি উপভোগের পর ফিরতি পথের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আকস্মিক এক পরিস্থিতিতে স্থবির হয়ে পড়ে খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়ক। পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যদের সড়ক অবরোধ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনার মধ্য দিয়ে পুরো এলাকা থমথমে হয়ে ওঠে। তবে সেনাসদস্য ও পুলিশের অদম্য সাহস, বিচক্ষণতা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপে চরম ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদে উদ্ধার পেয়েছেন সেখানে আটকে পড়া সব পর্যটক। এই শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযানের বিশদ তথ্য এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
ঘটনার সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার সকালে, যখন পর্যটকদের নিয়ে বিভিন্ন যানবাহনের বহর খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়ার অপেক্ষা করছিল। সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ইউপিডিএফ সমর্থিত একদল ব্যক্তি আকস্মিকভাবে সড়ক অবরোধ সৃষ্টি করে। তাদের এই অতর্কিত ব্লকেডের কারণে সাজেক ভ্রমণ শেষে নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার অপেক্ষায় থাকা পর্যটকবাহী ছোট-বড় শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে যায়। হঠাৎ রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত শত নারী, শিশু ও প্রবীণ পর্যটকদের মধ্যে এক অজানা ভয় ও অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে খবর পেয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং নিরপরাধ সাধারণ পর্যটকদের চলাচলের পথ সুগম করতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ টহল দল অতি দ্রুত গঙ্গারাম বাজার এলাকায় পৌঁছায়।
ঘটনাস্থলে গিয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অত্যন্ত ধৈর্য ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রথমে অবরোধকারীদের সঙ্গে কথা বলে সমঝোতার মাধ্যমে সড়ক সচল করার চেষ্টা চালান। পর্যটকদের ভোগান্তি ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শান্তি বজায় রেখে সড়ক ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু আলোচনার একপর্যায়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অবরোধকারীরা সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল মনোভাব প্রদর্শন শুরু করে। কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও আটকে থাকা অবোধ্য পর্যটকদের লক্ষ্য করে আকস্মিকভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকলে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ায় বাধ্য হয়ে পুলিশ ও সেনাসদস্যরা লাঠিচার্জের আশ্রয় নেন। লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার পর সড়কটিতে যানবাহন চলাচলের প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
তবে ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়ে এর কিছুক্ষণ পরই। আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে পাহাড়ের আড়াল থেকে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) একদল সশস্ত্র ক্যাডার হঠাৎ আভিযানিক দল ও সাধারণ পর্যটকদের লক্ষ্য করে লক্ষ্যভ্রষ্ট ও হিংসাত্মকভাবে গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছুড়ে এলাকাজুড়ে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চায়। সাজেকের নৈসর্গিক পাহাড় মুহূর্তের মধ্যেই অনাকাঙ্ক্ষিত গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে এবং বাসে ও গাড়িতে থাকা পর্যটকদের মধ্যে মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমন এক সংকটাপন্ন মুহূর্তে সেনাসদস্যরা অনন্য বীরত্ব ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পরিচয় দেন। উপস্থিত পর্যটকদের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হতে না দিয়ে সেনাবাহিনীর টহল দল দ্রুত আত্মরক্ষার্থে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা রক্ষায় পাল্টা গুলি চালায়। সেনা সদস্যদের দৃঢ় অবস্থান ও কৌশলগত জবাবের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় ইউপিডিএফের সশস্ত্র ক্যাডাররা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ত্রাসীরা গহীন পাহাড়ের ভেতরে চম্পট দেয়।
পাহাড় থেকে সন্ত্রাসীদের হটিয়ে দেওয়ার পর সেনাসদস্যরা ক্ষণিকের জন্যও দেরি করেননি। তারা অনতিবিলম্বে আটকে থাকা ৩ হাজার পর্যটককে সুরক্ষার বেষ্টনীতে নিয়ে নেন। সেনাবাহিনী ও পুলিশের একটি বড় বহর পর্যটকবাহী গাড়িগুলোর সামনে এবং পেছনে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় বা এসকোর্ট তৈরি করে। সেই সুদৃঢ় নিরাপত্তাবেষ্টনীতে সাজেক ভ্যালি থেকে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে প্রতিটি যানবাহনকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খাগড়াছড়ি শহরের নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই চরম অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পর পর্যটকরা যখন নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যান, তখন তাদের চোখেমুখের স্বস্তি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই সবার মনে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা তৈরি হলেও আইএসপিআর নিশ্চিত করেছে যে, সেনাসদস্যদের অত্যন্ত দক্ষ ও কৌশলগত পরিচালনার ফলে এই পুরো ঘটনায় কোনো পর্যটক, স্থানীয় বা নিরাপত্তাকর্মী হতাহত হননি।
এই উদ্বেগজনক ঘটনার নেপথ্য কারণ নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক তথ্য প্রদান করেছে আইএসপিআর। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ সমন্বিত অভিযান চলমান রয়েছে। সেনাদলের অব্যাহত এই অভিযানের মুখে চাপে পড়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ তাদের কৌশলগত অবস্থান হিসেবে জনবহুল ও পর্যটন এলাকাগুলোকে বেছে নেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে। পর্যটকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অশান্তি সৃষ্টি এবং সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই ছিল তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। যদিও এই ঘটনায় ইউপিডিএফের কোনো দাপ্তরিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
পার্বত্য অঞ্চলজুড়ে বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে পুনরায় ব্যক্ত করা হয় দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার অঙ্গীকার। সেখানে বলা হয়, পার্বত্য পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী সব সময়ই সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করে চলেছে। স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং পাহাড়ে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জীবন ও ধনসম্পদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয় রক্ষা করছে সেনাবাহিনী। পর্যটকদের নিরাপদে উদ্ধার করে আবারও প্রমাণিত হলো, পার্বত্য অঞ্চলের শান্ত পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই নিরলস প্রচেষ্টা ও ত্যাগ ভবিষ্যতেও বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হবে না।


