প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তের ওপারে ভারতের অভ্যন্তরে গুলিবিদ্ধ হয়ে খালেদ আহমদ নামে এক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ভারতের আকুয়া সীমান্ত এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের বরাতে জানা গেছে। পরদিন শুক্রবার স্থানীয় বাসিন্দারা ভারতীয়দের সহায়তায় তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তবে ঠিক কী পরিস্থিতিতে খালেদ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, কার গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে এবং ওই ঘটনার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহত খালেদ আহমদ সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের এরালীগুল গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মৃত ফজলু মিয়ার ছেলে। পরিবারের একজন সদস্যকে হারিয়ে স্বজনেরা শোকের মধ্যে রয়েছেন। সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সীমান্তের ওপারে কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে এবং তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য ব্যক্তিদের কী অবস্থা হয়েছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে খালেদ আহমদ ১০ জনের একটি দলের সঙ্গে কানাইঘাটের দনা সীমান্তের ১৩৩৩ নম্বর প্রধান সীমান্ত পিলারসংলগ্ন মিকিরপাড়া এলাকা দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। পরে তাঁরা ভারতের আকুয়া এলাকায় যান। সেখানে কোনো এক পর্যায়ে খালেদ গুলিবিদ্ধ হন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। তবে দলটি কী উদ্দেশ্যে সীমান্ত অতিক্রম করেছিল, সেখানে যাওয়ার আগে তাঁদের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছিল কিংবা ঘটনার সময় ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খালেদের সঙ্গে থাকা দলের অন্য সদস্যরা ঘটনার পর সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও জানা গেছে। তবে আহত ব্যক্তিদের সংখ্যা, তাঁদের আঘাতের ধরন এবং তাঁরা কীভাবে আহত হয়েছেন, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই দলের সদস্যরা কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ফিরে এসেছেন এবং তাঁদের কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছেন কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
আহত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নাজিম উদ্দিন জানান, ভারতের অভ্যন্তরে গুলিবিদ্ধ হয়ে খালেদের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার স্থানীয় বাসিন্দারা ভারতীয়দের সহায়তায় তাঁর মরদেহ সীমান্তের ওপার থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। খবর পেয়ে কানাইঘাট থানা পুলিশ নিহতের বাড়িতে যায়। মরদেহ উদ্ধারের পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়।
শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে খালেদের মরদেহ বাংলাদেশে নিয়ে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। সীমান্তের ওপারে মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। তবে মরদেহ কী পরিস্থিতিতে উদ্ধার করা হয়েছিল, সীমান্ত পারাপারের সময় কোনো আনুষ্ঠানিক সমন্বয় হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কী ভূমিকা পালন করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
কানাইঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, খালেদের মরদেহ তাঁর স্বজনেরা বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। পরে পুলিশ বাড়ি থেকে মরদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় সুরতহাল সম্পন্ন করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মরদেহের ময়নাতদন্ত শনিবার (১৭ অক্টোবর) হওয়ার কথা রয়েছে।
ওসি আরও জানান, খালেদ কার গুলিতে নিহত হয়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) থেকেও পুলিশকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে নিহতের স্বজনেরা জানিয়েছেন, ভারতের অভ্যন্তরে গুলিবিদ্ধ হয়ে খালেদের মৃত্যু হয়েছে। ফলে মৃত্যুর ঘটনাস্থল সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার পাশাপাশি গুলির উৎস, ঘটনার পরিস্থিতি ও দায়ী ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণ করা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ময়নাতদন্তের মাধ্যমে খালেদের শরীরে গুলির আঘাতের ধরন, আঘাতের অবস্থান এবং মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তিতে তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের জবানবন্দি ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে সহায়ক হতে পারে। তবে তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া মৃত্যুর জন্য কোনো ব্যক্তি বা বাহিনীকে দায়ী করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সীমান্ত এলাকায় চলাচল, অননুমোদিতভাবে সীমান্ত অতিক্রম এবং দুই দেশের ভূখণ্ডের মধ্যে সংঘটিত অপরাধের ঘটনা প্রায়ই জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কোনো বাংলাদেশি নাগরিক প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরে নিহত হলে তাঁর মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে স্থানীয় পুলিশের তদন্তের পাশাপাশি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তথ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খালেদের মৃত্যুর ঘটনাতেও কীভাবে গুলি ছোড়া হয়েছিল, সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা কী দেখেছেন—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া প্রয়োজন।
ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, খালেদের সঙ্গে থাকা দলের অন্য সদস্যদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও তাঁরা কোথায় চিকিৎসা নিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে পুলিশ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কথা হয়েছে কি না এবং তাঁরা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কী তথ্য দিতে পারবেন, তা জানা যায়নি। তাঁদের বক্তব্যের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে তথ্য সংগ্রহ করা গেলে ঘটনার ধারাবাহিকতা পরিষ্কার হতে পারে।
এদিকে, কানাইঘাট সীমান্তে এর আগেও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ অক্টোবর উপজেলার সোনারখেওড় সীমান্তের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শাহিন আহমদ নামে আরেক যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে একই উপজেলায় দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই পৃথক ঘটনা হিসেবে প্রতিটির তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা জরুরি।
সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক চলাচলের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে শুধু মরদেহ উদ্ধার বা দাফনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়; কীভাবে মৃত্যু হলো, কোন পরিস্থিতিতে গুলি ছোড়া হলো এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার ঝুঁকি কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সেসব প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা দরকার। একই সঙ্গে নিহতের পরিবার যেন ঘটনার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পায় এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
খালেদ আহমদের মৃত্যুর ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ময়নাতদন্তের ফলাফল, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের অগ্রগতি। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যও ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গুলির উৎস বা দায়ী পক্ষ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না।
একজন বাংলাদেশি যুবকের সীমান্তের ওপারে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা তাঁর পরিবারকে শোকের মুখে ফেলেছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি এবং দায় নির্ধারণ করা গেলে পরিবার ও এলাকাবাসীর অনিশ্চয়তা কমতে পারে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর থাকবে।


