প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের নার্সারী খাসিয়া পুঞ্জিতে আট হাজারের বেশি ফলবান পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ও অধিকারকর্মীরা। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং আদিবাসী পানচাষিদের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১১টায় মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব চত্বরে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। পরে প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে আয়োজকেরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান এবং পাঁচ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি জমা দেন।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখা, কুবরাজ আন্তঃপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠন, খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটি এবং ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা)-এর যৌথ উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের বক্তব্যে উঠে আসে, পানগাছ কেটে ফেলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি তাদের নিয়মিত আয় ও ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে নার্সারী পুঞ্জির পানের জুমে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় খাসিয়া ও গারো সম্প্রদায়ের ১০টি পরিবারের আট হাজারের বেশি ফলবান পানগাছ কেটে ফেলা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, এতে আনুমানিক ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তের ফল প্রকাশিত হয়নি।
পুঞ্জির বাসিন্দাদের জন্য পানচাষ কেবল একটি কৃষিকাজ নয়; এটি পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো, সন্তানদের পড়াশোনা চালানো এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় গড়ে তোলার অন্যতম অবলম্বন। দীর্ঘ সময় ধরে পরিচর্যা করে ফলবান পানগাছ থেকে আয় আসে। ফলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে পুঞ্জির বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনরায় জীবিকা গড়ে তোলার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফ্লোরা বাবলি তালাংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন মানবাধিকারকর্মী হেলেনা তালাং। এতে বক্তব্য দেন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) সিলেটের সদস্যসচিব আব্দুল করিম কিম, ভয়েস অব রিভার মনুর প্রধান নির্বাহী আসম ছালেহ সুহেল, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী অধিকার সুরক্ষা নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট ডাডলি ডেরিক প্রেন্টিস ও সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল হাসান।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা শাখার সহসভাপতি নারায়ন কুর্মী, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পংকজ কন্দ, মুন্ডা সমাজ কল্যাণ পরিষদ বৃহত্তর সিলেটের সাধারণ সম্পাদক লক্ষন মুন্ডা, লাউয়াছড়া পুঞ্জির মান্ত্রী ফিলা পতমী এবং খাসি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লান্ছার তংপের।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি বিশ্বজিৎ নন্দী ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব সূত্রধর, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মৌলভীবাজার জেলার ইনচার্জ উজ্জল রায়, ফাদার যোসেফ গমেজসহ স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দ। বক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান। সেখানে পাঁচ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে পানগাছ কাটার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং পানচাষিদের জীবন-জীবিকা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি ঘিরে পুঞ্জিতে বসবাসরত খাসিয়া ও গারো পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, ফলবান গাছ কেটে ফেলার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যতের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নতুন করে গাছ লাগানো হলেও তা থেকে আগের মতো আয় পেতে সময় লাগতে পারে। ফলে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় কারা জড়িত, কী কারণে পানগাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ কত—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য শোনা ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা জরুরি। তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রতিবাদকারীরা।
নার্সারী খাসিয়া পুঞ্জির এ ঘটনা পানচাষিদের জীবিকা রক্ষা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সামনে এনেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং নিরাপদে জীবিকা চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন তাদের প্রধান প্রত্যাশা। জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পর দাবিগুলোর বিষয়ে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন আয়োজক ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।


