প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) গত ১১ মাসে আট শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে ক্যাম্পাসজুড়ে শোক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পানিতে ডুবে, সড়ক দুর্ঘটনায়, অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে প্রাণ হারিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের এসব শিক্ষার্থী। এর মধ্যে সর্বশেষ চার দিনে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে সহপাঠী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোকের আবহ আরও গভীর হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মৃত আট শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনজন পানিতে ডুবে, দুজন সড়ক দুর্ঘটনায়, দুজন অসুস্থতাজনিত কারণে এবং একজন কীটনাশক পানের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। ঘটনাগুলো পৃথক সময়ে ও ভিন্ন পরিস্থিতিতে ঘটলেও প্রতিটি মৃত্যুই শিক্ষার্থী, তাঁদের পরিবার এবং বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে এসেছে।
সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিসান হাসান, রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার বাঁধন এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদমান রহমানের মৃত্যু। অল্প সময়ের ব্যবধানে তিন শিক্ষার্থীকে হারানোর ঘটনায় ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশেও শোকের প্রভাব পড়েছে।
গত সোমবার (১২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইইই বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিসান হাসান। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তবে তাঁর অসুস্থতার বিস্তারিত কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ৪ অক্টোবর কীটনাশক পান করেন রসায়ন বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার বাঁধন (২১)। প্রেমঘটিত বিরোধের কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঘটনার পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। দীর্ঘ নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি তরুণদের মানসিক সুস্থতা, সংকটের সময়ে সহায়তা পাওয়া এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া গত শনিবার (১০ অক্টোবর) মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদমান রহমান। শনিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন তপোবন আবাসিক এলাকার সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তরুণ বয়সে একজন শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যু তাঁর পরিবার ও সহপাঠীদের জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিক্ষার্থীকে হারায় বিশ্ববিদ্যালয়। গণিত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রতন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক শিক্ষার্থীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা সড়কে চলাচলের নিরাপত্তা, সতর্কতা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিষয়গুলোকে সামনে এনেছে।
পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাও শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। গত ৩০ জানুয়ারি সিলেটের পর্যটন এলাকা লালাখালে ঘুরতে গিয়ে গোসল করতে নেমে মারা যান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুসআব আমীন। জানা গেছে, তিনি সাঁতার জানতেন না। পর্যটনকেন্দ্রের নদী বা জলাশয়ে নামার আগে পানির গভীরতা, স্রোত এবং নিজের সাঁতারের সক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন থাকার প্রয়োজনীয়তা এ ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
গত ১৫ মে বিছানাকান্দিতে বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যান পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত বণিক (২২)। ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তিন বন্ধু মিলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নোম্যান্সল্যান্ডসংলগ্ন একটি জলাশয়ে গোসল করতে নামেন। একপর্যায়ে পানির স্রোত ও গভীরতার কারণে শান্ত তলিয়ে যান বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করেও সফল হননি। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
একইভাবে গত ১৬ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরের চৌকিদিখি এলাকার ব্রিটানিয়া সুইমিংপুলে সাঁতার কাটতে গিয়ে মারা যান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দীপাঞ্জন ঘোষ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সহপাঠীদের সূত্রে জানা যায়, ওই দিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে সুইমিংপুলে সাঁতার কাটার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরে সহপাঠীরা তাঁকে উদ্ধার করে নগরের দরগাহ গেট এলাকার নূরজাহান হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
গত বছরের ১২ নভেম্বর মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান ইইই বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আল আমিন। মৃত্যুর আগে পড়াশোনা নিয়ে তিনি অতিরিক্ত হতাশায় ভুগছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এই ঘটনাটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের চাপ, ব্যক্তিগত সংকট এবং মানসিক সুস্থতার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আনে। তবে কোনো শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা বা মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন জরুরি।
একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন শাবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিটি ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত সাড়া দিয়েছে। কিন্তু মৃত্যু অনিশ্চিত। একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার শোকাহত। মেধাবী শিক্ষার্থীদের হারানো শাবিপ্রবির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে মৃত শিক্ষার্থীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহপাঠী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান উপাচার্য।
শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর এসব ঘটনা পৃথকভাবে ঘটলেও এর মধ্য দিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। পর্যটনকেন্দ্র ও জলাশয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাঁতার না জানা ব্যক্তিদের পানিতে নামার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা, সড়কে চলাচলের সময় নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ এবং অসুস্থ শিক্ষার্থীদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সংকটের সময়ে শিক্ষার্থীরা যেন নির্ভয়ে সহায়তা চাইতে পারেন, সে ধরনের সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবন তরুণদের জন্য উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং ভবিষ্যৎ গড়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা শারীরিক অসুস্থতার মতো নানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন শিক্ষার্থীরা। সংকটের সময়ে পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তা তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা, প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তার সুযোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তবে আট শিক্ষার্থীর মৃত্যুর সবগুলো ঘটনা একই ধরনের নয়। কোনোটি দুর্ঘটনা, কোনোটি অসুস্থতাজনিত এবং কোনোটি অন্য পরিস্থিতিতে ঘটেছে। ফলে প্রতিটি ঘটনার কারণ ও প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। এসব মৃত্যুর সংখ্যা একত্রে বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরলেও, প্রতিটি ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছাড়া সবগুলোর জন্য একটি অভিন্ন কারণ নির্ধারণ করা সমীচীন নয়।
শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে তাঁদের পরিবারগুলোর। সন্তানকে ঘিরে পরিবারের আশা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মুহূর্তে বদলে গেছে। সহপাঠীদের কাছে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর স্মৃতি, শিক্ষকদের কাছে প্রিয় শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের কাছে একের পর এক শোকের সংবাদ দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তামূলক পরিবেশ জোরদার করা গেলে ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। আট শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শাবিপ্রবি পরিবার এখন শোকাহত; একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ জীবন ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।


