প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের ধর্মীয় সম্প্রীতিকে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এমপি। তিনি বলেছেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সৌহার্দ্যের যে ঐতিহ্য বাংলাদেশে রয়েছে, তা দেশের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সম্প্রীতি ধরে রাখা এবং আরও সুদৃঢ় করা সবার দায়িত্ব।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে সিলেট সিটি করপোরেশনের সভাকক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভা ও অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে নগরীর বিভিন্ন দুর্গাপূজা মণ্ডপের প্রতিনিধিদের হাতে আর্থিক অনুদান তুলে দেওয়া হয়। এ সময় ধর্মীয় উৎসব পালনে সহযোগিতা, উপাসনালয়ের উন্নয়ন এবং নগরীর অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশের মতো ধর্মীয় সম্প্রীতি পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। বিশ্বের অনেক বড় গণতান্ত্রিক দেশেও এমন সম্প্রীতির নজির দেখা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের যে সংস্কৃতি রয়েছে, তা জাতীয় জীবনের একটি অনন্য সম্পদ। এই ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে মন্দির ও পূজামণ্ডপে পূজার্চনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়। সিলেটেও প্রতিবছর নানা আয়োজনে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়। উৎসবটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে আয়োজকদের প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সব ধর্মের মানুষ যেন নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারেন, সে বিষয়ে সরকার সচেষ্ট। দুর্গাপূজার মণ্ডপে আর্থিক অনুদান দেওয়ায় তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে ধন্যবাদ জানান। তাঁর মতে, ধর্মীয় উৎসব উদযাপনে সহযোগিতা কেবল আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক আস্থা এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টিও জড়িত।
তিনি আরও বলেন, সিলেটের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগে ও পরে তিনি মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় পরিদর্শন করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত নানা সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ধর্মীয় উপাসনালয় শুধু প্রার্থনার স্থান নয়, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো স্থানীয় মানুষের সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও পারস্পরিক সহযোগিতার কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকার প্রয়োজন, অবকাঠামোর অবস্থা এবং মানুষের চাহিদাকে বিবেচনায় নেওয়াও জরুরি।
অনুষ্ঠানে দুর্গাপূজার আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ও উপকারভোগী মণ্ডপের সংখ্যা তুলে ধরা হয়। সিলেট নগরীর ৮৫টি পূজামণ্ডপে প্রতিটিতে ৪০ হাজার টাকা করে মোট ৩৪ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। এই সহায়তা পূজার আয়োজনের বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে মণ্ডপ পরিচালনা কমিটিগুলোকে সহযোগিতা করবে। তবে অনুদানের অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হবে, সে বিষয়ে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
দুর্গাপূজার মতো বড় ধর্মীয় উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে মণ্ডপ সাজানো, পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ, আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত অর্থের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার সহযোগিতা অনেক মণ্ডপের আয়োজন সহজ করতে পারে। এ ধরনের অনুদান বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় সম্প্রীতির পাশাপাশি সিলেট নগরীর উন্নয়ন নিয়েও বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সিলেট সিটি করপোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ডে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫০০ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন করা হয়েছে। বাকি সড়কগুলোর উন্নয়নের জন্যও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
নগরীর সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন সড়কগুলোর উন্নয়নেও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। শিগগিরই এসব কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। নগরীর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হলে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সুবিধা বাড়তে পারে। তবে উন্নয়নকাজের সুফল নিশ্চিত করতে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, নির্মাণমান বজায় রাখা এবং সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সিলেট নগরীর যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সংযোগ তৈরির প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ক্বিনব্রিজের পাশে সুরমা নদীর ওপর আরও একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেতুটি নির্মিত হলে নগরীর কোন কোন এলাকায় যান চলাচলের চাপ কমবে বা যোগাযোগে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সে বিষয়ে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি। প্রকল্পের বাস্তবায়ন, নকশা, অর্থায়ন ও সময়সীমা সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত তথ্য জানা গেলে এর সম্ভাব্য প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।
এ ছাড়া হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করার কথাও জানান মন্ত্রী। নগরীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিরাপদ আবাসন ও মৌলিক সেবা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিবারের প্রয়োজন, আবাসনের উপযুক্ত স্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নগরবাসীর বিশুদ্ধ পানির সমস্যা নিরসনে একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, চেঙ্গেরখালের পানি শোধন করে সিলেট নগরীর মানুষের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নিরাপদ পানির সরবরাহ নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ ধরনের প্রকল্পের সুফল পেতে পানি শোধনাগারের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। প্রকল্পটির ব্যয়, বাস্তবায়নের সময়সীমা ও সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা সম্পর্কে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার। এ সময় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বিপিএম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন, সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী এবং জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের পরিচালক বদরুজ্জামান সেলিম বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রমের অধ্যক্ষ স্বামী চন্দ্রনাথানন্দ মহারাজ, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি সুদীপ রঞ্জন সেন বাপ্পু এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সভায় পূজামণ্ডপগুলোর প্রতিনিধিদের হাতে অনুদান তুলে দেওয়া হয়।
ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে এমন মতবিনিময় সভা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করে। তবে সম্প্রীতির চর্চা শুধু উৎসবের সময়েই সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমান অধিকার, নিরাপত্তা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে সম্প্রীতির ঐতিহ্য আরও শক্তিশালী হয়।
সিলেটের ধর্মীয় সম্প্রীতি, নগরীর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পায়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে ৮৫টি মণ্ডপে ৩৪ লাখ টাকা অনুদান বিতরণ ছিল আয়োজনের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম। পাশাপাশি সড়ক, সেতু, বিশুদ্ধ পানি ও আবাসনসংক্রান্ত উদ্যোগের কথা তুলে ধরে নগরীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি এবং নাগরিকেরা কতটা সুফল পাচ্ছেন, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক তদারকির ওপর।


