প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ভারতীয় মদ, দুটি এয়ারগান, বিপুল পরিমাণ ভারতীয় ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ মালামাল জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। জব্দ করা এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি)। সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান, মাদকদ্রব্য পাচার ও অবৈধ পণ্য পরিবহন প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাতে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট, সংগ্রাম ও বিছনাকান্দি এবং জৈন্তাপুর উপজেলার ডিবিরহাওর সীমান্ত এলাকায় একাধিক বিশেষ অভিযান চালানো হয়। বিশেষ গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৪৮ বিজিবির কয়েকটি অপারেশন দল এসব অভিযানে অংশ নেয়। বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় ও পরিবহনের মাধ্যমে লুকিয়ে রাখা মালামাল উদ্ধার করা হয়।
অভিযানের একটি পর্যায়ে ফলের ক্যারেটের আড়ালে একটি ডিআই পিকআপে লুকিয়ে রাখা ১৬৮ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার করা হয়। পণ্য পরিবহনের পরিচিত উপকরণের আড়ালে মদ বহনের এই ঘটনায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য আনা-নেওয়ার কৌশল সম্পর্কে নতুন করে নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। তবে গাড়িটির মালিকানা, চালক কিংবা এই চালানের সঙ্গে কারা জড়িত—এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
একই অভিযানের ধারাবাহিকতায় অন্য একটি স্থান থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় দুটি ভারতীয় এয়ারগান উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ ভারতীয় ওষুধ এবং অন্যান্য মালামাল জব্দ করা হয়েছে। তবে উদ্ধার করা ওষুধের ধরন, সংখ্যা, বাজারমূল্য এবং অন্য পণ্যগুলোর বিস্তারিত বিবরণ পৃথকভাবে জানানো হয়নি। ফলে জব্দ করা মোট মালামালের ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার আনুমানিক মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।
সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক, বিজিওএম বলেন, সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষা, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য পাচার প্রতিরোধে বিজিবির অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে এসব মালামাল জব্দ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান ও গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার রাখা হবে বলে জানান তিনি।
বিজিবি আরও জানিয়েছে, জব্দ করা মালামালের বিষয়ে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, কিংবা উদ্ধার করা মালামালের বিষয়ে কোনো মামলা দায়ের করা হয়েছে কি না—সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
সিলেটের সীমান্তবর্তী অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে সংলগ্ন এই এলাকার বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে বৈধ বাণিজ্য ও মানুষের চলাচল যেমন হয়, তেমনি সীমান্তের সুযোগ নিয়ে অবৈধ পণ্য পরিবহনের ঝুঁকিও থাকে। এ কারণে সীমান্তে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সন্দেহজনক যানবাহন তল্লাশি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চোরাচালান প্রতিরোধের ক্ষেত্রে শুধু পণ্য জব্দ করাই নয়, এসব পণ্যের উৎস, পরিবহনপথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো চালান জব্দ হওয়ার পর এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্রের পরিচয় শনাক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়। সে কারণে উদ্ধার করা মালামালের নথিপত্র, পরিবহনের তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনানুগ তদন্ত পরিচালনা করা প্রয়োজন।
সীমান্ত দিয়ে মাদকদ্রব্য অবৈধভাবে প্রবেশ করলে তা জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। একইভাবে ওষুধের বৈধ আমদানি, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতকরণের নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি। যথাযথ অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়া ওষুধ আমদানি বা বিক্রি করা হলে পণ্যের মান, সংরক্ষণ এবং নিরাপদ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। তবে এই অভিযানে জব্দ করা ভারতীয় ওষুধগুলোর প্রকৃতি বা মান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি; তাই সেগুলোকে নিম্নমানের বা ক্ষতিকর বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এয়ারগান উদ্ধারের বিষয়টিও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব বহন করে। তবে উদ্ধার করা দুটি এয়ারগান কোন কাজে ব্যবহারের জন্য আনা হয়েছিল কিংবা সেগুলোর সঙ্গে কোনো অপরাধের যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে উদ্ধার করা মালামাল পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের ওপর।
সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহজনক পণ্য পরিবহন বা চোরাচালানের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো গেলে অপরাধ প্রতিরোধে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসা ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলা এবং যথাযথ কাগজপত্র সংরক্ষণ করা ব্যবসায়ীদের জন্যও জরুরি।
বিজিবির এই অভিযানে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার মালামাল জব্দের ঘটনা সীমান্তে চোরাচালানবিরোধী তৎপরতার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। তবে অভিযানের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে শুধু জব্দ করা পণ্যের পরিমাণের ওপর নয়; বরং অবৈধ চালানের উৎস শনাক্ত, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একই পথে পুনরায় চোরাচালান ঠেকানোর সক্ষমতার ওপরও।
সিলেটের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর সীমান্তে পরিচালিত এই অভিযানের পর জব্দ করা মালামালের বিষয়ে সরকারি বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিজিবি। তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পণ্যের উৎস এবং সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে আরও তথ্য সামনে এলে ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে। সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং বৈধ বাণিজ্যের পরিবেশ সুরক্ষিত রাখতে এ ধরনের অভিযান ও কার্যকর নজরদারি অব্যাহত থাকা প্রয়োজন।


