প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মো. সহিদুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে শহীদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রায় তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁর জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ২ কোটি ৮৯ লাখ ১০ হাজার ৭৫১ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুদকের সিলেট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি করা হয়। দুদকের সহকারী পরিচালক জুয়েল মজুমদার বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করায় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে মামলা দায়েরের অর্থ অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দুদকের এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে সহিদুল ইসলাম চৌধুরীর নামে বা তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে বিবেচিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। অনুসন্ধানে পাওয়া সম্পদের মূল্য তাঁর জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে সন্দেহ তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সম্পদের উৎস ও আর্থিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয় কমিশন।
এ ধরনের অনুসন্ধানে সাধারণত সম্পদের পরিমাণ, অর্জনের সময়, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বৈধ আয়ের তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়। সম্পদ অর্জনের সঙ্গে ঘোষিত আয় বা বৈধ আর্থিক উৎসের সামঞ্জস্য না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে। সহিদুল ইসলাম চৌধুরীর ক্ষেত্রেও সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করা হয়েছিল বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, গত ৫ জানুয়ারি তাঁর কাছে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ পাঠানো হয়। বিধি অনুযায়ী, নোটিশ পাওয়ার পর ২১ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি সম্পদ বিবরণী দাখিল করেননি বলে অভিযোগ করেছে কমিশন। সময় বাড়ানোর জন্যও কোনো আবেদন করা হয়নি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার অভিযোগে মামলাটি করা হয়। দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ধারায় নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার বিষয়টি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে মামলার পরবর্তী ধাপে তদন্তের মাধ্যমে নোটিশ জারি, তা পৌঁছানো, নির্ধারিত সময়সীমা এবং বিবরণী দাখিল না করার কারণসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা হবে।
দুদকের মামলাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন সরকারি দায়িত্ব পালনকারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সম্পদের উৎস নিয়ে জনমনে আগ্রহ রয়েছে। জনপ্রতিনিধি বা সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দপ্তরে কাজ করা কর্মকর্তাদের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের বিষয়ে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত না করে আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সহিদুল ইসলাম চৌধুরী সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০২৩ সালের সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে এপিএস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। মেয়রের দাপ্তরিক কার্যক্রমে এ ধরনের পদে দায়িত্ব পালনকারীরা যোগাযোগ, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে সহযোগিতা করে থাকেন।
সিটি করপোরেশন স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবা, নগর অবকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা, সড়ক উন্নয়ন ও অন্যান্য জনসেবামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নির্ধারণ করা গেলে তা স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ও সহিদুল ইসলাম চৌধুরী—দুজনই আত্মগোপনে চলে যান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁদের বর্তমান অবস্থান কিংবা এ মামলার বিষয়ে সহিদুল ইসলাম চৌধুরীর বক্তব্য সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য নেই। এ কারণে মামলার অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংবাদটির পূর্ণতা ও ভারসাম্য বাড়াবে।
দুদকের অনুসন্ধান ও মামলা দায়েরের পর এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে অভিযোগের পক্ষে থাকা তথ্যপ্রমাণের বিস্তারিত যাচাই। সম্পদের মূল্য নির্ধারণ, মালিকানার প্রকৃতি, অর্থের উৎস এবং সম্পদ বিবরণী জমা না দেওয়ার কারণ তদন্তের আওতায় আসতে পারে। পাশাপাশি নোটিশ জারি ও আইনগত সময়সীমা অনুসরণের বিষয়গুলোও মামলার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হবে।
দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে স্বচ্ছতা বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনগত অধিকার নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব হলো প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যদিকে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরও অভিযোগের জবাব দেওয়া ও আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার রয়েছে।
সিলেটের এই মামলাটি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া তথ্যপ্রমাণ ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর। প্রায় তিন কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে দুদকের উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের পাশাপাশি সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার কারণও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন হলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ তৈরি হবে।


