প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বা আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। বাংলাদেশসহ চারটি দেশ ও অঞ্চলের সদস্যপদ পাওয়ার আবেদন ও অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া পর্যালোচনা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে এগিয়ে নিতে একটি বিশেষ ‘অ্যাডহক অ্যাকসেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের সুপারিশ অনুমোদন করেছে আরসিইপির সদস্যদেশগুলো। এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বড় একটি বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম আরসিইপি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে আরসিইপির যৌথ কমিটি বা আরজেসির দেওয়া সুপারিশের প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মতি জানান সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশসহ আবেদনকারী দেশ ও অঞ্চলের সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় পরবর্তী ধাপ শুরু করার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ছাড়াও একই অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ চিলি, দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা এবং হংকং (চীন)। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়েও আরসিইপিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে বাণিজ্য জোটটির সম্প্রসারণের সম্ভাবনা এখন এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত অঞ্চলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে আরসিইপি সদস্যরা জোটটিকে একটি উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো হিসেবে ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। নতুন গঠিত অ্যাডহক অ্যাকসেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ সদস্যপদ প্রত্যাশী দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা পরিচালনা করবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন সদস্যদের বাণিজ্যিক ও কারিগরি সক্ষমতা, চুক্তির বিভিন্ন শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে।
বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য এ উদ্যোগের গুরুত্ব বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি রপ্তানি বাণিজ্য। তৈরি পোশাক, চামড়া, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন খাতের পণ্য বিদেশি বাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে প্রবেশের সুবিধা, শুল্ক কাঠামো এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়গুলো বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আরসিইপিতে যোগ দিতে পারলে বাংলাদেশের সামনে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বড় অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বর্তমানে এই জোটে আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশের পাশাপাশি চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড রয়েছে। এসব দেশের সম্মিলিত বাজার বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য সম্ভাবনাময় একটি বড় অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক সুবিধার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন বাজারে যে ধরনের বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে থাকে, উত্তরণের পর তার কিছু অংশ পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন ও কার্যকর বাণিজ্যচুক্তির মাধ্যমে বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আরসিইপিতে সদস্যপদ পাওয়া শুধু বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, বাণিজ্যনীতি, কাস্টমস ব্যবস্থা, পণ্যের মান, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়ও জড়িত। ফলে সদস্যপদ পাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যত এগোবে, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে তত বেশি কারিগরি ও নীতিগত প্রস্তুতির প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, আরসিইপির মতো বৃহৎ বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশ নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ পেতে পারে। কোনো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যদি একটি বৃহৎ আঞ্চলিক বাজারে তুলনামূলক সহজে পণ্য সরবরাহের সুযোগ পায়, তাহলে উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করার আগ্রহ বাড়তে পারে। বিশেষ করে শ্রমনির্ভর শিল্পের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রেও আরসিইপি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ইতোমধ্যে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। তবে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে বাজার সুবিধা, উৎপাদন ব্যয়, দ্রুত সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক শর্তের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বৃহৎ আঞ্চলিক বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলে রপ্তানি খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়লে তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি কাঠামোর বাইরে অন্যান্য পণ্যের অংশগ্রহণও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর পাশাপাশি আরসিইপির সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বর্তমানে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি পণ্য বিভিন্ন দেশের কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হয়ে থাকে। এই বাস্তবতায় কোনো দেশের বাণিজ্যিক অবস্থান শুধু নিজস্ব পণ্য রপ্তানির ওপর নির্ভর করে না; বরং আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আরসিইপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারলে এ ধরনের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বড় বাণিজ্য জোটে যুক্ত হলে দেশীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। বিদেশি পণ্য সহজে বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশীয় শিল্পের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের মান, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আরসিইপিতে বাংলাদেশের যোগদানের প্রক্রিয়ায় অ্যাডহক অ্যাকসেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সুপারিশ অনুমোদন তাই চূড়ান্ত সদস্যপদ লাভের সমান নয়। এটি মূলত পরবর্তী পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও কারিগরি মূল্যায়নের পথ খুলে দিয়েছে। আবেদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা, প্রয়োজনীয় শর্ত পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই সদস্যপদ নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে।
ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার বাণিজ্য উপমন্ত্রী দিয়াহ রোরো এস্তি উইদিয়া পুত্রি এবং নিউজিল্যান্ডের পার্লামেন্ট সদস্য ড. শেন রেটি যৌথভাবে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে আরসিইপির ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ, বাণিজ্য সহযোগিতা এবং সদস্যপদ প্রত্যাশী দেশগুলোর বিষয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের জন্য সামনে এখন মূল বিষয় হবে সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া। বৃহৎ এই বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য দেশীয় অর্থনীতিকে প্রস্তুত করাও হবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আরসিইপিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতি কেবল একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এলডিসি-উত্তরণ-পরবর্তী বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।


