প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, শিক্ষক নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব এবং আর্থিক দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ তুলে টানা চতুর্থ দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন জাতীয়তাবাদী আদর্শের ‘সাদা দল’ সমর্থিত শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি অংশ। আন্দোলনে একাত্মতা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও অংশ নিয়েছেন।
আন্দোলনকারীরা বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালা দিয়ে সেখানে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তারা উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসনের নানা সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক, একাডেমিক ও সার্বিক পরিবেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে উপাচার্যের বিরুদ্ধে ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির আংশিক খতিয়ান’ শিরোনামে একটি লিফলেটও বিতরণ করা হয়েছে। এতে মোট ১৮টি অভিযোগ তুলে ধরা হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
লিফলেটে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ করে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়ার কথা ছিল—এমন কয়েকজন প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সিকৃবির নিজস্ব মেধাবী গ্র্যাজুয়েটদের বঞ্চিত করে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলকভাবে অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, কয়েকজন নিয়োগপ্রাপ্তের সঙ্গে উপাচার্যের নিজ এলাকা বা পরিচিতজনের সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনের সময় তড়িঘড়ি করে ২২ জন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উপাচার্যের নিজ জেলা ও আবাসস্থলের বলে লিফলেটে দাবি করা হয়েছে। কয়েকজন যথাযথভাবে আবেদন না করেও নিয়োগ পেয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এডহক ভিত্তিতে দুজন কর্মকর্তা নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে আন্দোলনকারীদের প্রকাশিত লিফলেটে। ওই দুই ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় ও কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের একজনের বিরুদ্ধে একজন নারী শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের হয়রানির অভিযোগও সামনে এসেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, তুচ্ছ অজুহাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সাময়িক বহিষ্কার, পদোন্নতি বন্ধ, পেনশন স্থগিত, কারণ দর্শানোর নোটিশসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং একাডেমিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
কয়েকজন শিক্ষকের পদোন্নতি দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখার অভিযোগও করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের ভাষ্য, যোগ্য শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও একটি অনুষদে অন্য অনুষদ থেকে ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তকে তারা প্রশাসনিক নিয়মের ব্যত্যয় এবং স্বেচ্ছাচারিতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয় ও উন্নয়নকাজ নিয়েও বিস্তর অভিযোগ তোলা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, কেন্দ্রীয় স্টোরের মাধ্যমে নিম্নমানের স্মার্ট বোর্ড, চেয়ার, আসবাবপত্র ও কম্পিউটার সামগ্রী কেনা হয়েছে। কয়েকটি দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে বেশি দরদাতাকে কাজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সড়ক, ড্রেন, লেকের চারপাশের ওয়াকওয়েসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজেও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামের একটি ফাটল মেরামতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে লিফলেটে। আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, অডিটোরিয়ামের প্রায় তিন ফুট দীর্ঘ ফাটল মেরামতে ৫১ লাখ টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে এবং এর একটি বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অর্থ ব্যয়ের নথি বা অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, কয়েকজন শিক্ষককে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও কমিটির দায়িত্ব দিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করা হয়েছে। একই ব্যক্তিকে একাধিক নিয়োগ বোর্ড, গবেষণা কার্যক্রম, কেন্দ্রীয় স্টোরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।
উপাচার্যের দায়িত্বে থাকার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। লিফলেটে দাবি করা হয়েছে, অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলাম ১১ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। এরপরও তিনি উপাচার্য পদে বহাল থাকায় তার দায়িত্ব পালনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে দাবি তাদের। এ বিষয়ে অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এর বাইরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকার সময় ভ্যাকসিন বিক্রি, গবেষণা প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মসহ আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে। জাপানে পিএইচডি করতে গিয়ে ডিগ্রি সম্পন্ন না করে দেশে ফেরার অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত জীবনের কিছু বিতর্কিত বিষয়ও লিফলেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুতর এবং ব্যক্তিগত প্রকৃতির হওয়ায় সংশ্লিষ্ট নথি বা স্বাধীন তদন্ত ছাড়া এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
এদিকে উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পাঁচ শিক্ষকসহ ১১ শিক্ষক-কর্মকর্তা পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
পদত্যাগকারীদের মধ্যে বিভিন্ন আবাসিক হলের প্রভোস্টসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষক-কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাদের বক্তব্য, বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন অনিয়ম দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়ে আপত্তি জানালেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
পদত্যাগকারী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। রাজস্ব খাতের অর্থে কিছু উন্নয়ন ও মেরামতকাজ করা হলেও এসব ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। অডিটোরিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে টেকওভার করার আগেই সেখানে মেরামতকাজ করার বিষয়টিও তারা প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেছেন।
ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের আরও অভিযোগ, ইলেকট্রনিকস ও আসবাবপত্র কেনার ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার কথা। কিন্তু কয়েকটি ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেছেন পদত্যাগকারীরা। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক আটজন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সিকৃবির নিজস্ব গ্র্যাজুয়েটদের তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রার্থীদের অধিকাংশকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন পদত্যাগকারী শিক্ষক দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গ্র্যাজুয়েটদের যোগ্যতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
আন্দোলনে যোগ দেওয়া ছাত্রদল নেতারাও উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সানাউল হোসেন সনিসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
‘সাদা দল’ সমর্থিত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক মোজাম্মেল হক বলেন, উপাচার্যের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদে শিক্ষক ও কর্মকর্তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। বর্তমান প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
পদত্যাগকারী প্রভোস্ট অধ্যাপক মো. কাউছার হোসেন বলেন, বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে শিক্ষার পরিবেশ ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তিরা অব্যাহতি চেয়েছেন এবং তাদের দায়িত্বের মেয়াদও শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারা আর দায়িত্ব চালিয়ে যেতে চান না। তাদের পদত্যাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।
উপাচার্য আরও বলেন, তাকে সরানোই আন্দোলনকারীদের মূল লক্ষ্য। সরকার তাকে নিয়োগ দিয়েছে এবং সরকার চাইলে তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন।
শিক্ষক নিয়োগে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি দাবি করে অধ্যাপক আলিমুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্য ব্যক্তিদেরই শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের সবার প্রথম শ্রেণি রয়েছে এবং আইন ও বিধি মেনেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের পদত্যাগ এবং আন্দোলনে ছাত্রদলের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিস্থিতি এখন উত্তপ্ত। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যার ওপরই এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা অনেকাংশে নির্ভর করছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশের প্রত্যাশা, দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।


