প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরকে ঘিরে ২০১৩ সালের ৫ মে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ ৩০ আসামিকে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের বিষয়ে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
বৃহস্পতিবার ৩ সেপ্টেম্বর সকালে মামলাটির শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। আদালতের এই নির্দেশের ফলে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক কার্যক্রমে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ যুক্ত হলো। পলাতক আসামিদের আদালতের সামনে হাজির করার ক্ষেত্রে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রক্রিয়াটিও এখন কার্যকর হবে।
প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া এ আদেশে আসামিদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের জন্য দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট আসামিদের আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বিষয়টিও উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
এদিকে মামলায় গ্রেপ্তার থাকা আসামিদের মধ্যে ১০ জনকে বৃহস্পতিবার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান এবং লেখক শাহরিয়ার কবিরসহ অন্যরা রয়েছেন। সাংবাদিক ফারজানা রূপা অসুস্থ থাকায় তাকে এদিন আদালতে হাজির করা হয়নি।
মামলাটির পটভূমি ২০১৩ সালের ৫ মে রাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই দিন রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, সংঘর্ষ এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নানা ধরনের দাবি, পাল্টা দাবি এবং বিতর্ক রয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিষয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ হিসেবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে আসামিদের যোগসাজশে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং ওই অভিযানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। মামলার অভিযোগে ঘটনাটিকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত একটি হত্যাযজ্ঞ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো বিচারিকভাবে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। আদালতে সাক্ষ্য, নথি, অন্যান্য প্রমাণ এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মামলায় শাপলা চত্বরসহ সংশ্লিষ্ট ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের একটি তালিকাও আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৬১ জন নিহতের তালিকা পাওয়া গেছে এবং তাদের মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। নিহতের সংখ্যা ও ঘটনার প্রকৃতি নিয়ে অতীতে বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য ও দাবি সামনে এসেছে। ফলে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত চিত্র নির্ধারিত হবে।
এর আগে গত ২৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ শেখ হাসিনাসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন। একই সঙ্গে মামলায় পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আদালতের আদেশ অনুযায়ী, যেসব আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত ও তাদের আদালতের আওতায় আনার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের নাম থাকায় বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সাবেক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হওয়ায় এর বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে আদালতের বিচারাধীন বিষয়ে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করাই আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতে হাজির করার মধ্য দিয়ে একদিকে বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে পলাতক আসামিদের হাজির করার জন্য সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের বিজ্ঞপ্তির উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট আসামিদের আদালতে আত্মসমর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা।
আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে পলাতক ৩০ আসামির কেউ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন কি না, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রক্রিয়া কতটা এগোয় এবং মামলার পরবর্তী বিচারিক পদক্ষেপ কী হয়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।
শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ঘিরে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নানা আলোচনা ও বিতর্ক চলে আসছে। নিহতদের পরিবার, রাজনৈতিক পক্ষ, মানবাধিকারকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ ঘটনাটির সত্য উদ্ঘাটন ও জবাবদিহির দাবি জানিয়ে আসছে। এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর প্রমাণ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট আসামিদের আইনগত অবস্থান কী দাঁড়ায়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আদালতের সর্বশেষ আদেশের মধ্য দিয়ে মামলাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা এবং সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ বিচারিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে মামলার চূড়ান্ত সত্য ও দায় নির্ধারণ হবে আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই।


