প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সিলেটের মণিপুরি পাড়াগুলোতে ধর্মীয় আবেগ, নৃত্য, সংগীত ও ঐতিহ্যের আবহে সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঝুলনযাত্রা উৎসব। শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার প্রেম, ভক্তি ও লীলাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই উৎসব কয়েক দিন ধরে সিলেটের বিভিন্ন মণিপুরি অধ্যুষিত এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে। নগরের শিবগঞ্জ মণিপুরি পাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মণিপুরি সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে অংশ নেন। তাদের নৃত্য, সংগীত ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় প্রাণ ফিরে পায় বহু পুরোনো এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
ঝুলনযাত্রা মূলত বৈষ্ণব ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। রাধা ও কৃষ্ণের দোল বা ঝুলনকে কেন্দ্র করে এ উৎসব পালিত হলেও সিলেটের মণিপুরি সম্প্রদায়ের কাছে এটি কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; বরং নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও নৃত্যধারাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দীর্ঘ সময় ধরে সিলেটের বিভিন্ন মণিপুরি পাড়ায় নিজস্ব রীতি ও ঐতিহ্য অনুসরণ করে ঝুলনযাত্রা উদযাপিত হয়ে আসছে।
এবারও কয়েক দিনব্যাপী আয়োজনে বিভিন্ন মণিপুরি পাড়ায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ঝুলন নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ এবং নৃত্য-গীতের পরিবেশনা দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে মণিপুরি নৃত্যের ছন্দ, পোশাক ও পরিবেশনার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য উৎসবটিকে আলাদা মাত্রা দেয়।
নগরের শিবগঞ্জ মণিপুরি পাড়ায় আয়োজিত ঝুলনযাত্রার একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেটে অবস্থিত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব রাজেশ ভাটিয়া। তিনি ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের পক্ষ থেকে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সদস্যদের শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ধরে রেখে উৎসব উদযাপন অব্যাহত রাখার জন্য আয়োজকদের প্রশংসা করেন।
রাজেশ ভাটিয়ার উপস্থিতি অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব তৈরি করে। কারণ, সিলেটের মণিপুরি সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভারতের মণিপুরসহ বৃহত্তর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সংস্কৃতি, ভাষা, নৃত্য ও ঐতিহ্যকে ঘিরে পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। ফলে এমন একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের প্রতিনিধির উপস্থিতি সাংস্কৃতিক বন্ধনের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে আসে।
সিলেটের মণিপুরি সম্প্রদায়ের উৎসবগুলোতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঝুলনযাত্রাতেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। নৃত্যের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য ও রাধা-কৃষ্ণের লীলার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা। ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও নৃত্যভঙ্গির সঙ্গে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সমন্বয় পুরো আয়োজনকে করে তোলে প্রাণবন্ত।
স্থানীয়ভাবে এই উৎসব শুধু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। মণিপুরি সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এ ধরনের আয়োজন দেখতে আসেন। ফলে উৎসবের মাধ্যমে একদিকে যেমন মণিপুরি সম্প্রদায়ের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় আরও দৃশ্যমান হয়, অন্যদিকে বৃহত্তর সমাজের মানুষের সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক যোগাযোগও বাড়ে।
সিলেটে মণিপুরি সম্প্রদায়ের বসতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। নগরের শিবগঞ্জ, মির্জাজঙ্গলসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের বসবাস ও সাংস্কৃতিক চর্চার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। মণিপুরি নৃত্য, তাঁতশিল্প, পোশাক, ভাষা ও ধর্মীয় উৎসব সিলেটের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঝুলনযাত্রার মতো উৎসব সেই বৈচিত্র্যকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সিলেটের বিভিন্ন মণিপুরি পাড়ায় ঝুলনযাত্রা উপলক্ষে নৃত্য, ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারের আয়োজনেও সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিয়ে সম্প্রদায়ের প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মও উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এতে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও ধর্মীয় সংস্কৃতির চর্চা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য শুধু ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণও জরুরি। সেই দিক থেকে ঝুলনযাত্রার মতো উৎসব মণিপুরি তরুণদের নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। নৃত্য, পোশাক, সংগীত ও ধর্মীয় আচার শেখার মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের ঐতিহ্যকে ধারণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারে।
ঝুলনযাত্রার ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি রয়েছে গভীর মানবিক আবেদন। উৎসবের সময় পরিবার ও স্বজনদের একত্র হওয়া, প্রার্থনা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেওয়া এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। একই সঙ্গে আনন্দ ও সম্প্রীতির পরিবেশে একটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্য উদযাপন বৃহত্তর সমাজেও ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
সিলেটে এবার ঝুলনযাত্রার আয়োজনকে ঘিরে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা শহরের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক চরিত্রকেও তুলে ধরেছে। বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সহাবস্থানের জন্য পরিচিত সিলেটের সাংস্কৃতিক পরিসরে মণিপুরি সম্প্রদায়ের এই আয়োজন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয়কে যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি সিলেটের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও সমৃদ্ধ করেছেন।
প্রায় দুই শতাব্দীর পথ পেরিয়ে আজও ঝুলনযাত্রার মতো আয়োজন টিকে থাকা মণিপুরি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক দৃঢ়তারই প্রতিফলন। সময়ের পরিবর্তন, নগরায়ণ ও আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। আর সেই ঐতিহ্য যখন নৃত্য, সংগীত ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তা কেবল অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকে না; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ হয়ে ওঠে।
সিলেটের শিবগঞ্জ মণিপুরি পাড়ায় ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনের প্রতিনিধির শুভেচ্ছা বিনিময় এবং বিভিন্ন মণিপুরি পাড়ায় কয়েক দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন তাই এবারের ঝুলনযাত্রাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে সম্পন্ন হওয়া এই আয়োজন আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—কোনো সম্প্রদায়ের শতবর্ষের ঐতিহ্য কেবল তাদের নিজস্ব সম্পদ নয়, তা একটি অঞ্চলের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও মূল্যবান অংশ।


