প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বন্যা, জলাবদ্ধতা, কৃষি উপকরণের সংকট এবং খাদ্য ও জ্বালানির বাড়তি দামের চাপে দেশের কৃষি খাতে ঝুঁকি আরও বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের প্রায় ১০ লাখ কৃষি পরিবারের জরুরি কৃষি সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। এসব পরিবারের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ বলে সংস্থাটির মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
এফএওর হিসাবে, আগের বছরের সেপ্টেম্বরের মূল্যায়নের তুলনায় জরুরি কৃষি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে এমন পরিবারের সংখ্যা এবার প্রায় ২ লাখ বেড়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র পরিসরে কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোই সংকটের সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করছে। কৃষির ওপর নির্ভরশীল এসব পরিবারের জন্য উৎপাদন অব্যাহত রাখা, খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা এবং আয় ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে কৃষি সহায়তার প্রয়োজন নির্ধারণে এফএওর পরিচালিত ১৪তম পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকার ৬ হাজার ১৪৩টি পরিবারের সঙ্গে কম্পিউটার-চালিত টেলিফোন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে মূল্যায়নটি তৈরি করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরুরি কৃষি সহায়তার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি এমন পরিবারের বড় অংশ রয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে। এসব অঞ্চলের অনেক পরিবার কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং আয়-রোজগারের ক্ষেত্রে একাধিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষ করে নদী অববাহিকা, হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি উদ্বেগজনক।
এফএওর মূল্যায়নে কৃষি সহায়তার প্রয়োজন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু একটি দুর্যোগকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যেসব কৃষি পরিবার একই সময়ে অর্থনৈতিক, ব্যক্তিগত, কৃষিসংক্রান্ত এবং প্রাকৃতিক বিভিন্ন সংকট বা দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে, তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে এবং নিজেরা কৃষি সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে, তাদের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টি প্রতিবেদনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ কৃষি পরিবারের ৮৪ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ থেকে শুরু করে পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্য ও জ্বালানি ব্যয়—সবকিছুর মূল্য বাড়ায় এসব পরিবারের ওপর একসঙ্গে একাধিক চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংস্পর্শে আসা কৃষি পরিবারের হারও বেড়েছে। এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন পরিবারের হার ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের পর্যায়ের তুলনায় ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। বর্ষা মৌসুমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদী, হাওর ও নিচু এলাকার পরিবারগুলোতে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনের তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
খাদ্য কেনার ক্ষেত্রেও পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ স্পষ্ট হয়েছে। এফএওর জরিপে প্রতি তিনটি পরিবারের মধ্যে প্রায় দুটি পরিবার জানিয়েছে, তারা বাকিতে খাদ্য কিনেছে। অর্থাৎ অনেক পরিবার নিয়মিত আয় বা হাতে থাকা অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে পারছে না। ভবিষ্যৎ আয়ের প্রত্যাশায় ধার বা বাকিতে খাদ্য সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।
স্বাস্থ্য খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় কমিয়েছে। আয় কমে যাওয়া এবং খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে পরিবারের বাজেট সংকুচিত হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও ব্যয় কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার জানিয়েছে, চলতি মৌসুমের ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও সার কেনার ব্যয় কমিয়েছে। কৃষক যদি সময়মতো মানসম্মত বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করতে না পারেন, তাহলে উৎপাদনের পরিমাণ ও মান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর প্রভাব শুধু কৃষক পরিবারের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না; স্থানীয় খাদ্য সরবরাহ এবং বাজারদরেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
নগদ সহায়তার প্রয়োজনীয়তাও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নগদ সহায়তার আবেদন করা পরিবারের হার এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ে ৪১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। ১৩তম পর্যায়ের জরিপে যেখানে ১৬ শতাংশ পরিবার নগদ সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছিল, ১৪তম পর্যায়ে সেই হার বেড়ে ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিবর্তন কৃষি পরিবারের আর্থিক দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃষি উপকরণ কেনা, খাদ্য সংগ্রহ, চিকিৎসা ব্যয় কিংবা দুর্যোগের পর ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আয় কমে গেলে এবং একই সময়ে পরিবারের ব্যয় বেড়ে গেলে কৃষকদের হাতে বিনিয়োগের মতো পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না।
ফসল উৎপাদনের সমস্যার হার অবশ্য আগের পর্যায়ের তুলনায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখায়নি। দুই পর্যায়ের জরিপেই প্রায় অর্ধেক ফসল উৎপাদনকারী পরিবার উৎপাদনসংক্রান্ত সমস্যার কথা জানিয়েছে। এসব সমস্যার মধ্যে জমিতে অতিরিক্ত পানি, ফসলের রোগ এবং সারের সংকট প্রধান হিসেবে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের কৃষিতে পানি একদিকে যেমন অপরিহার্য, অন্যদিকে অতিরিক্ত পানি অনেক সময় কৃষকের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। অতিবৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি কিংবা বন্যার কারণে জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে ফসলের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রোগবালাই বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে নিচু জমি ও হাওরাঞ্চলে এ ঝুঁকি আরও বেশি।
ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল বিক্রি করেও সমস্যায় পড়ছেন কৃষকেরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত ফসলের কম দামের কারণে বিক্রিতে সমস্যার মুখোমুখি হওয়া পরিবারের হার আগের জরিপের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। আগের পর্যায়ে এ হার ছিল ৯ শতাংশ, যা এবার বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
কৃষকের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। উৎপাদন খরচ বাড়ার বিপরীতে যদি বাজারে ফসলের দাম কম থাকে, তাহলে ভালো ফলন হলেও কৃষকের প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে। এতে পরবর্তী মৌসুমে বীজ, সার, শ্রম ও অন্যান্য উপকরণ কেনার সক্ষমতা কমে যায়। ফলে কৃষকের ঋণনির্ভরতা বাড়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর পরিস্থিতিতে আগের পর্যায়ের তুলনায় কিছুটা স্বস্তির চিত্র পাওয়া গেছে। তারপরও পশুর রোগ এবং খাদ্যের বাড়তি ব্যয় এখনো বড় সমস্যা হয়ে আছে। সমস্যায় থাকা পশুপালনকারী পরিবারগুলোর মধ্যে ৯১ শতাংশ পশুর রোগ এবং ১৭ শতাংশ পশুখাদ্যের উচ্চ ব্যয়ের কথা জানিয়েছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে পশুপালন অনেক পরিবারের বিকল্প আয়ের উৎস। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি কিংবা অন্যান্য প্রাণী পালন করে অনেকে পরিবারের খাদ্য ও নগদ আয়ের চাহিদা পূরণ করেন। রোগের কারণে পশু মারা গেলে বা উৎপাদনশীলতা কমে গেলে এসব পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পশুখাদ্যের দাম বাড়লে পালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
এই পরিস্থিতিতে আমন চাষের মৌসুম শুরুর আগে কৃষকদের সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এফএও। সংস্থাটি মৌসুমের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি উপকরণ সরবরাহের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সময়মতো বীজ, সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কৃষকের হাতে পৌঁছানো গেলে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সহজ হবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
এর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তা, পশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং পানি ব্যবস্থাপনায় সহায়তা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে এফএও। বিশেষ করে বন্যা ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে কৃষিজমিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকার ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে।
এফএওর এই মূল্যায়ন দেশের কৃষি খাতের সামনে থাকা বহুমুখী ঝুঁকির একটি চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি উপকরণের ব্যয় এবং ফসলের বাজারদর—সব মিলিয়ে কৃষকের ওপর চাপ বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা না পৌঁছালে তাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের কৃষি অর্থনীতিকে সচল রাখতে তাই শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। কৃষকদের উৎপাদনের আগেই প্রয়োজনীয় উপকরণ, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পানি ব্যবস্থাপনার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় ১০ লাখ কৃষি পরিবারের জরুরি সহায়তার প্রয়োজনের এই হিসাব সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। সামনে আমন মৌসুম, আর বর্ষার প্রভাবও পুরোপুরি কাটেনি। এমন সময়ে কৃষকদের পাশে কার্যকর ও সময়োপযোগী সহায়তা পৌঁছাতে পারলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকেই ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করা সম্ভব হবে না, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ মোকাবিলা করা সহজ হবে।


