প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে পারস্পরিক অংশীদারত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যদিকে ভারতের শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের অবকাঠামো, উৎপাদন, জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও নতুন শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
সিআইআই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির ডিরেক্টর জেনারেল চন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি। বৈঠকে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানো এবং সরকারি পর্যায়ের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ব্যবসায়িক পর্যায়ে বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের আয়তন, জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির আকারে পার্থক্য থাকলেও দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এই সুযোগকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করতে হলে বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা কমানো, যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করা এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করা গেলে পণ্য পরিবহন, শিল্প স্থাপন এবং আঞ্চলিক বাজার সম্প্রসারণে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা সুবিধা পেতে পারেন।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হলেও এ অঞ্চলের আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য এখনো সম্ভাবনার তুলনায় কম। বাণিজ্যমন্ত্রী মনে করেন, পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এতে শুধু বাংলাদেশ ও ভারত নয়, বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিও লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ নিয়েও আলোচনা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আগের স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। এ বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতির প্রত্যাশা করেন।
ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের ভিসা জটিলতাও বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম, চিকিৎসা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি ভিসা নিয়ে বারবার আবেদন করার প্রক্রিয়া ব্যবসা ও পেশাগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যারা নিয়মিত ব্যবসা, চিকিৎসা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করেন, তাদের জন্য কয়েক মাস পরপর নতুন ভিসার আবেদন করা বাস্তবসম্মত নয়। এ ধরনের নিয়মিত যাতায়াতকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ভিসা ব্যবস্থা তৈরিতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পে সহযোগিতার জন্য দুটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেয় সিআইআই। একটি টাস্কফোর্স অবকাঠামো উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি প্রকল্পে সহযোগিতা নিয়ে কাজ করবে। অন্যটি সেমিকন্ডাক্টর, গ্রিন হাইড্রোজেন, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং ডাটা সেন্টারের মতো ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তি ও শিল্পখাতে সহযোগিতার সুযোগ খুঁজবে।
সিআইআই প্রতিনিধিরা ভারতের অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ভারতে অবকাঠামো খাতে প্রায় ২৫ লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগ হয়েছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে। বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতেও দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ভারতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের স্থানীয় উৎপাদনকারী শিল্পের সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। ভারতীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বলেন, দেশের অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো সম্ভব।
এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরে এক প্রতিনিধি বলেন, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। স্থলবন্দর দিয়ে এসব পণ্য আমদানিতে কখনো কখনো ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সরবরাহ ব্যবস্থার এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
ভোগ্যপণ্য বা এফএমসিজি খাতেও বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিআইআই। ঢাকার আশপাশে সাবান, হোম কেয়ার ইনসেক্টিসাইড, ফ্র্যাগরেন্সসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের জন্য একটি আধুনিক সমন্বিত কারখানা স্থাপনের আগ্রহের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের মান নিশ্চিত করতে কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
শিল্প খাতে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সিআইআই। প্রতিনিধিরা জানান, তাদের উদ্ভাবিত স্টিম-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করলে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক ও খাদ্যশিল্পে গ্যাস ব্যবহারে ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। তবে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামোর বৈষম্যের কারণে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না বলে তারা দাবি করেন।
বৈঠকে দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টিও উঠে আসে। বাংলাদেশের তরুণদের ভারতীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে সিআইআই। পাশাপাশি বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের তৃতীয় কোনো দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা কমাতে সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সব মিলিয়ে বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কেবল প্রচলিত পণ্য বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন, অবকাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন অর্থনীতির খাতে বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। দুই দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে উঠলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বাস্তবভিত্তিক ও ফলপ্রসূ হতে পারে।
ভৌগোলিক নৈকট্যকে যদি কার্যকর যোগাযোগ, সহজ বাণিজ্যব্যবস্থা এবং বিনিয়োগের সুযোগে রূপান্তর করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতই লাভবান হতে পারে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়া, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনাও বাড়বে। তাই সরকারি পর্যায়ের আলোচনার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সুনির্দিষ্ট উদ্যোগই দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে নতুন গতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


