প্রকাশ: ১৮ অগাস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ঢাকা: লিবিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে দীর্ঘদিন আটক থাকার পর আরও ১৭৪ বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। মঙ্গলবার ভোরে বুরাক এয়ারের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। দেশে ফেরা এসব মানুষের অধিকাংশই সমুদ্রপথে অনিয়মিতভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে লিবিয়ায় আটকা পড়েছিলেন। তাদের প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনপথ, মানবপাচার এবং উন্নত জীবনের আশায় বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার কঠিন বাস্তবতা।
বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ফেরত আসা বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ লিবিয়ার গ্যানফুদা ও অন্যান্য ডিটেনশন সেন্টারে অবস্থান করছিলেন। পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর তাদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। এর আগে চলতি বছরও বিভিন্ন দফায় লিবিয়ার আটককেন্দ্র থেকে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
ফেরত আসা ১৭৪ জনের মধ্যে তিনজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে। এছাড়া ১৫ জন শারীরিকভাবে অসুস্থ বলে জানা গেছে। ফলে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের স্বাভাবিকভাবে দেশে ফেরার আনন্দের সঙ্গে চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্ব পেয়েছে। আইওএমের সহযোগিতায় প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা, খাবার, যাতায়াত সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার নজির রয়েছে।
দেশে ফেরা এসব মানুষের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত এক যাত্রার গল্প। অনেকেই দালাল বা মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্নে লিবিয়ায় যান। তাদের বলা হয়, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে পৌঁছে গেলে অপেক্ষা করছে উন্নত জীবন, ভালো আয় এবং পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা। কিন্তু বাস্তবে অনেকের জন্য সেই যাত্রা পরিণত হয় ভয়াবহ অভিজ্ঞতায়। কেউ সমুদ্রপথে বিপদের মুখে পড়েছেন, কেউ লিবিয়ায় আটক হয়েছেন, আবার কেউ অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
লিবিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করা অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আফ্রিকা থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় বিভিন্ন দেশের মানুষ লিবিয়ায় জড়ো হন। বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি অংশও এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেন। কিন্তু নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পরিবর্তে দালালচক্রের ওপর নির্ভর করে যাত্রা শুরু করায় অনেকেই শেষ পর্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েন।
সমুদ্রপথের এই যাত্রায় নৌযান ডুবে যাওয়া, নিখোঁজ হওয়া কিংবা প্রাণহানির ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অনেককে আবার আটক রাখা হয় বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে। ফলে ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়া মানুষের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মাসের পর মাস কিংবা আরও দীর্ঘ সময় আটককেন্দ্রে থাকতে হয় অনেককে।
এবার দেশে ফিরে আসা ১৭৪ বাংলাদেশির ঘটনাও সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে নারী ও শিশুর উপস্থিতি এই অনিয়মিত অভিবাসনপথের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। অর্থনৈতিকভাবে ভালো ভবিষ্যতের আশায় একটি পরিবার বা একজন মানুষ যে সিদ্ধান্ত নেন, তা কখনো কখনো পুরো পরিবারকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিতে পারে। দেশে থাকা স্বজনদের জন্যও এমন পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগ ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, লিবিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে থাকা বাংলাদেশিদের পর্যায়ক্রমে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আটক বাংলাদেশিদের পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। এর আগে গ্যানফুদা ও তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার থেকেও বিভিন্ন দফায় বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানো হয়েছে।
সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর এসব প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুধু দেশে ফিরিয়ে আনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশে ফেরার পর প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের অভিজ্ঞতা সমাজের সামনে তুলে ধরার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ, বিদেশ যাওয়ার আগে অনেকেই দালালদের কাছ থেকে বাস্তবতার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র শুনে থাকেন। ইউরোপে পৌঁছানোর সহজ পথ হিসেবে যে যাত্রাকে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবে তা অনেকের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এর আগেও লিবিয়া থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের নিজেদের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, সম্ভাব্য অভিবাসনপ্রত্যাশীরা যেন দালালদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস না করেন এবং অনিয়মিত পথে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সম্পর্কে মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রয়োজন যেমন রয়েছে, তেমনি নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন মানুষ যখন বিদেশে যাওয়ার জন্য পরিবারের সঞ্চয়, জমি কিংবা সম্পদ বিক্রি করেন, তখন ব্যর্থ বা বিপজ্জনক অভিবাসনের ক্ষতি শুধু তার নিজের ওপর পড়ে না; পুরো পরিবার আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়ে।
লিবিয়া থেকে দেশে ফেরা ১৭৪ বাংলাদেশির জন্য তাই বিমানবন্দরে অবতরণ কেবল একটি যাত্রার সমাপ্তি নয়, বরং নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, আটক জীবন এবং ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর তারা আবার পরিবার ও স্বজনদের কাছে ফিরেছেন। তবে তাদের এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও সামনে এসেছে—বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়মিত পথ বেছে নেওয়া কোনোভাবেই নিরাপদ সমাধান নয়।
বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, দ্রুত ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় দালালদের প্রলোভনে পড়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই অনেকের জীবন থেমে যায়, কেউ নিখোঁজ হন, আবার কেউ বছরের পর বছর বন্দিজীবনে আটকে পড়েন। লিবিয়ার ডিটেনশন সেন্টার থেকে ফিরে আসা এই ১৭৪ জনের গল্প সেই কঠিন বাস্তবতারই আরেকটি সতর্কবার্তা।


