প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। সর্বশেষ আরও দুই শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিভাগজুড়ে হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ জনে। নতুন করে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকালে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সর্বশেষ পরিস্থিতির তথ্য নিশ্চিত করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃত দুই শিশুর একজনের বয়স চার মাস এবং অন্যজনের বয়স সাত মাস। তারা দুজনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চার মাস বয়সী শিশুটি সিলেট শহিদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। অপরদিকে সাত মাস বয়সী আরেক শিশু সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিল। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৫৩ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রতিদিনই নতুন করে উপসর্গ নিয়ে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা ঘটছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫৪ জন সন্দেহভাজন রোগী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে একই সময়ে পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন করে কারও শরীরে হাম শনাক্ত হয়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ল্যাবরেটরিতে নতুন রোগী শনাক্ত না হলেও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। কারণ হামের উপসর্গ অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য ভাইরাসজনিত অসুস্থতার সঙ্গে মিল থাকতে পারে। এজন্য চিকিৎসকরা রোগীদের ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভাগজুড়ে টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। যেসব শিশু এখনো নিয়মিত টিকার আওতায় আসেনি, তাদের তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের শনাক্ত করছেন এবং অভিভাবকদের টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নিতে উৎসাহিত করছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলেও নির্ধারিত সময়ে টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নির্ধারিত বয়সে হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা হলে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। তাই কোনো শিশুর টিকা বাদ পড়ে থাকলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার জন্য অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিকিৎসকরা আরও জানিয়েছেন, হামের প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু কিংবা যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে হাম দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা এবং শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ সেবন না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যেও আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং চিকিৎসক সংকট যেন রোগীদের সেবায় প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়েও স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ বাস্তবায়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করতে পারলেই হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তারা অভিভাবকদের গুজব বা ভুল তথ্যের পরিবর্তে স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সিলেটে হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৯৫-এ পৌঁছানো নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।


