প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘ প্রায় ছয় বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সিলেটের বহুল আলোচিত মুরারী চাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। আলোচিত এ মামলায় প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় চার আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ ও মামলার বাদীপক্ষ, অন্যদিকে আসামিপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
আদালতের রায় অনুযায়ী প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম রনি এবং অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপরদিকে আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ইসলাম এবং মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে। সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার সকাল থেকেই সিলেট আদালত প্রাঙ্গণে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং নিরাপত্তার মধ্যেই আট আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। আদালতে নেওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, তারা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত নন এবং রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। তারা আরও দাবি করেন, ভুক্তভোগী তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেননি।
তবে আদালতের রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আসামিপক্ষ। আসামিপক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী বলেন, মামলার বিচারিক কার্যক্রমে আসামিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। তার দাবি, মামলায় প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই এবং ভুক্তভোগীও আদালতে আসামিদের শনাক্ত করেননি। তিনি বলেন, অপরাধ প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। এজন্য তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। আসামিপক্ষের অন্যান্য আইনজীবীরাও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে জানান, নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে তারা আইনগত লড়াই চালিয়ে যাবেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ ও মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবীরা আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, মামলার সাক্ষ্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল এবং অন্যান্য উপস্থাপিত আলামত বিবেচনায় আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন। তারা মনে করেন, এ রায় নারী নির্যাতন ও সংঘবদ্ধ যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে বিচারব্যবস্থার একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এই মামলার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে। মামলার এজাহার অনুযায়ী, ওইদিন সন্ধ্যায় এক নবদম্পতি প্রাইভেটকারে করে শাহপরান মাজারে বেড়াতে যান। ফেরার পথে টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামিয়ে স্বামী পাশের একটি দোকানে গেলে কয়েকজন যুবক তাদের জিম্মি করে। পরে প্রাইভেটকারসহ তাদের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের বালুচর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামীকে মারধর করে বেঁধে রাখা হয় এবং স্ত্রীকে ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা ও প্রাইভেটকার রেখে দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগীর স্বামী বিষয়টি পুলিশকে জানান। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তরা সে সময় ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত হওয়ায় পুলিশ প্রথমদিকে ছাত্রাবাসে প্রবেশে বিলম্ব করে। এরই মধ্যে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে রাতভর অভিযান চালিয়ে ছাত্রাবাসের বিভিন্ন কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরান থানায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার পরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে তিন দিনের মধ্যেই ছয়জন নামীয় আসামি ও সন্দেহভাজন আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তের একপর্যায়ে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তদন্তে ভুক্তভোগীর আলামত এবং আসামিদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হলে আটজনের মধ্যে ছয়জনের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়। এই ফরেনসিক প্রতিবেদন মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ও মিসবাউল ইসলামকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। অন্যদিকে রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়। অভিযুক্তদের সবাই সে সময় ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষ আটজনকেই স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চারজনের ছাত্রত্ব ও একাডেমিক সনদ বাতিল করে। একই ঘটনায় ছাত্রাবাস থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পৃথক অস্ত্র মামলাও দায়ের করা হয়।
মামলার বিচারিক কার্যক্রমও ছিল দীর্ঘ ও জটিল। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হলেও বিভিন্ন আইনি জটিলতা, বিচারিক এখতিয়ার পরিবর্তনের আবেদন এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনার কারণে কার্যক্রমে বিলম্ব ঘটে। বাদীপক্ষ একপর্যায়ে হাইকোর্টে আবেদন জানিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় এবং মামলায় মোট ২৪ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন ভুক্তভোগী নারী, তার স্বামী, তদন্ত কর্মকর্তা, আসামিদের জবানবন্দি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট, এমসি কলেজের শিক্ষক, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বহুল আলোচিত এই মামলার রায়ের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হলেও মামলার আইনি প্রক্রিয়া এখানেই শেষ নয়। আসামিপক্ষ আপিল করলে উচ্চ আদালতে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক প্রতিবেদন, আইনগত যুক্তি এবং নিম্ন আদালতের পর্যবেক্ষণ নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে। সেই বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে মামলার চূড়ান্ত পরিণতি।
এমসি কলেজের এই নৃশংস ঘটনা শুধু সিলেট নয়, গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঘটনার পর নারী নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা এবং যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন ও প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঘোষিত এই রায় সেই আলোচিত ঘটনার বিচারিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ এবং সময়োপযোগী বিচার নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।


