প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সবুজে ঘেরা পাহাড় আর চা বাগানের জনপদ মৌলভীবাজার। এই জেলার আকবরপুরে জেলা শহর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে নিরলস গবেষণার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের কৃষিতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছে। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত অঞ্চলভিত্তিক মাটির গুণাগুণ ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একের পর এক কৃষিবিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে এই কেন্দ্রটি। গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে তারা এরই মধ্যে ১১টি উন্নত জাতের ফলের উদ্ভাবন করেছে, যা শুধু মৌলভীবাজার নয়, বরং সারা দেশের কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিজ্ঞানীদের এই দীর্ঘমেয়াদী শ্রম আর মেধায় সমৃদ্ধ হচ্ছে আমাদের জাতীয় কৃষিখাত, আর নতুন জাতের ফল ও ফসলের উপস্থিতিতে বদলে যাচ্ছে কৃষকদের ভাগ্য।
মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে উদ্ভাবিত ফলের তালিকাটি নজর কাড়ার মতো। ১৯৯৬ সালে এখানে বারি পেয়ারা-২, বারি লিচি-২ ও বারি লিচি-৩ উদ্ভাবন করা হয়। পরের বছর ১৯৯৭ সালে আসে বারি বাতাবি লেবু-১ এবং বারি কামরাঙা-১ ও ২। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে বারি কাঁঠাল-১, ২০১২ সালে বারি আম-১০ এবং ২০১৮ সালে বারি জারা লেবু-১ উদ্ভাবনের মাধ্যমে তারা তাদের গবেষণার উৎকর্ষ প্রমাণ করে। সবশেষে ২০২৩ সালে বারি কাঁঠাল-৫ উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের সাফল্যের মুকুটে আরেকটি পালক যুক্ত করেছে। একেকটি জাত উদ্ভাবনের পেছনে থাকে কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ বছরের কঠিন সাধনা। মাটির বৈশিষ্ট্য যাচাই, রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো এবং অধিক ফলন নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পালন করেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণার পরিধি শুধু ফলমূলে সীমাবদ্ধ নেই। সবজি ও মাঠ ফসল নিয়ে চলছে সমানতালে কাজ। লাউ, মিষ্টি কুমড়া, চিচিঙ্গা, বরবটি, লালশাক, শিম, পটল ও টমেটোর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির জাত উদ্ভাবনে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে যেসব সবজি অন্য অঞ্চলে খুব ভালো ফলন দেয় কিন্তু এই অঞ্চলের আবহাওয়া ও মাটির প্রতিকূলতার কারণে উৎপাদন কম হয়, সেসব ফসলকে কীভাবে এই অঞ্চলের উপযোগী করা যায়, তা নিয়ে চলছে অবিরাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এ ছাড়া তেল জাতীয় ফসল যেমন বাদাম, সরিষা, সূর্যমুখী ও গোলমরিচের উন্নত জাত উদ্ভাবনের কাজও চলমান রয়েছে। এসব ফসলের ক্ষেত্রে প্রতিটি জাত উদ্ভাবনের জন্য প্রায় ২ থেকে ৩ বছরের নিবিড় গবেষণার প্রয়োজন হয়।
গবেষণার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক ও সুশৃঙ্খল। প্রথমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সবচেয়ে সফল জাতগুলোর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেগুলোকে আঞ্চলিক আবহাওয়া ও মাটির উপযোগী করার জন্য পরীক্ষামূলক চাষাবাদ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেলে চলে ব্যাপক পরিসরে গবেষণা। কখনো কখনো আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের সহায়তায় বিদেশ থেকেও ফসলের জাত সংগ্রহ করে সেগুলোকে এই অঞ্চলের মাটিতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য দীর্ঘ যাচাই-বাছাই চালানো হয়। ৩১৪ বিঘা আয়তনের এই সুবিশাল গবেষণা কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, ড্রাগন, কফি, আম, জাম্বুরা, লিচু থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির মাঠ ফসলে ঠাসা পুরো চত্বর। বিক্রয়ের জন্য এখানে একটি নার্সারিও তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে কৃষকরা সুলভ মূল্যে উন্নত চার ও বীজ সংগ্রহ করতে পারছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মুত্তালিব মিয়ার স্মৃতিতে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমরা এই প্রতিষ্ঠানটিকে নিরিবিলি পরিবেশে নিরলস গবেষণার কাজে মগ্ন থাকতে দেখছি। সাধারণ মানুষ সেখানে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে না পারলেও এর সুফল তারা প্রতিনিয়ত ভোগ করছেন। এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত চারা ও বীজ কৃষকদের জীবনে যে আমূল পরিবর্তন এনেছে, তা স্থানীয় পর্যায়ে বেশ প্রশংসিত। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল মাজেদ মিয়া জানান, গবেষণার লক্ষ্য কেবল উদ্ভাবন নয়, বরং কৃষকদের দোরগোড়ায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া। তাদের উদ্ভাবিত জাতগুলো বর্তমানে কৃষকরা সাফল্যের সঙ্গে চাষ করছেন, যা জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখছে।
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দীন গবেষণার মূল দর্শন তুলে ধরে বলেন, অঞ্চলভিত্তিক কৃষিই আধুনিক সময়ের চাহিদা। দেশের এক প্রান্তের ফসল অন্য প্রান্তে উৎপাদন করতে হলে কেবল জলবায়ু নয়, মাটির অম্লত্ব ও পুষ্টিগুণও বিবেচনা করতে হয়। সময় যত গড়াচ্ছে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলে নতুন নতুন ফলের জাত উদ্ভাবন তাদের জন্য সহজতর হচ্ছে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ড. মাহমুদুল ইসলাম নজরুল এই প্রতিষ্ঠানটিকে একটি নন-প্রফিটেবল অর্গানাইজেশন হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, মুনাফা নয়, কৃষকদের স্বার্থই এখানে প্রধান। কৃষকদের আগ্রহী করে তোলার জন্য তারা সীমিত মূল্যে চারা ও বীজ সরবরাহ করেন। এক সময় যে ফল ও সবজি এই অঞ্চলে জন্মাত না, এখন সেগুলোই এখানকার কৃষক চাষ করছেন—এটাই তাদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
কৃষি গবেষণার এই দীর্ঘ পথ চলায় মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পাহাড়ী ও চা বাগান সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে বৈচিত্র্যময় কৃষিপণ্যের উৎপাদন সম্ভব করতে বিজ্ঞানীদের যে শ্রম, তা আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তায় এক বড় সহায়ক শক্তি। কৃষকরা এখন নতুন নতুন জাতের দিকে ঝুঁকছেন, আয় করছেন বেশি এবং মাটির সঠিক ব্যবহারে সমৃদ্ধ করছেন নিজেদের জীবন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই গবেষণা কেন্দ্রটি ভবিষ্যতে আরও উন্নত জাতের ফসলের জন্ম দেবে এবং বাংলাদেশের কৃষি মানচিত্রকে করবে আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় কৃষিবান্ধব মানুষের। গবেষণার এই জয়যাত্রা যেন কখনো থেমে না থাকে, সেটিই সবার কাম্য।


