প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রবাসজীবনের কঠোর পরিশ্রম শেষে একদিন পরিবারের কাছে হাসিমুখে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। পরিবারের ভাগ্য বদলাতে, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে এবং স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন কাতারে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। জীবনের নির্মম পরিণতিতে তারা ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে। কাতারে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কানাইঘাট উপজেলার পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ মঙ্গলবার সকালে নিজ গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারি, প্রতিবেশীদের কান্না আর হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মঙ্গলবার সকাল পৌনে সাতটার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২২৬ ফ্লাইটে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ। সেখানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা নিহতদের স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করেন। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার চেকও পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ সময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানবন্দর থেকে পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো নিয়ে যাওয়া হয় কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে। গ্রামের প্রবেশমুখ থেকেই শত শত মানুষ মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মরদেহ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কেউ সন্তান হারিয়েছেন, কেউ স্বামী, কেউ ভাই, আবার কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন। আত্মীয়-স্বজনদের পাশাপাশি প্রতিবেশী ও দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষও এই শোক ভাগ করে নিতে উপস্থিত হন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েকদিন আগেও প্রিয়জনদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। কেউ বলেছিলেন, ছুটিতে দেশে ফিরবেন। কেউ আবার পরিবারের জন্য নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই কথোপকথনই হয়ে রইল শেষ স্মৃতি। তাদের প্রত্যাবর্তন হলো না জীবিত অবস্থায়; বরং কাঠের কফিনে ঢেকে নিথর দেহ হয়ে ফিরে এলেন জন্মভূমিতে।
দুপুরে স্থানীয় গাছবাড়ি মাদ্রাসা মাঠে একসঙ্গে পাঁচজনের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। একসঙ্গে পাঁচটি মরদেহ সারিবদ্ধভাবে রাখা হলে উপস্থিত মানুষের অনেকেই অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। জানাজায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আলেম-ওলামা, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং হাজারো মানুষ অংশ নেন। নামাজ শেষে নিহতদের জন্য দোয়া করা হয় এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়। পরে নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর বলেন, এই দুর্ঘটনা শুধু পাঁচটি পরিবারের নয়, পুরো কানাইঘাটবাসীর জন্য গভীর শোকের ঘটনা। একই এলাকার পাঁচজন তরুণ প্রবাসীর একসঙ্গে মৃত্যু সবাইকে মর্মাহত করেছে। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
জানা গেছে, গত ২১ জুন কাতারের শাহানিয়া এলাকায় একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার বাসিন্দা। দুর্ঘটনার পর থেকেই স্বজনরা উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অবশেষে তাদের মরদেহ দেশে পাঠানো হয়।
নিহত পাঁচ প্রবাসী হলেন ঝিঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের আমরপুর গ্রামের মৃত আব্দুন নূরের ছেলে জিবাল উদ্দিন, মাঝতালুক গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন, আগতালুক গ্রামের সেলিম আহমদের ছেলে মস্তাক আহমদ, একই গ্রামের মৃত মড়া মিয়ার ছেলে জুবায়ের আহমদ এবং দক্ষিণ বাণীগ্রাম ইউনিয়নের নিজ গাছবাড়ী গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে কাদের আহমদ। তারা সবাই জীবিকার তাগিদে কাতারে কর্মরত ছিলেন এবং নিজ নিজ পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে এই তরুণরা নিজেদের পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। তাদের পাঠানো অর্থেই অনেক পরিবার চলত, সন্তানদের লেখাপড়া হতো এবং নতুন স্বপ্ন গড়ে উঠছিল। হঠাৎ এমন দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। অনেক পরিবার এখন আর্থিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি গভীর মানসিক সংকটের মধ্যেও পড়েছে।
সামাজিক নেতৃবৃন্দ বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। নিজেদের পরিবার ও দেশের উন্নয়নে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তাই বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আরও কার্যকর সমন্বয় এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হলেও স্থানীয়দের মতে, এটি শোকাহত পরিবারগুলোর জন্য সাময়িক সহায়তা মাত্র। দীর্ঘমেয়াদে এসব পরিবারের পুনর্বাসন, শিশুদের শিক্ষা এবং নির্ভরশীল সদস্যদের জীবিকা নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকেও এগিয়ে আসতে হবে।
একসঙ্গে পাঁচটি জানাজা এবং পাঁচটি কফিনের দৃশ্য কানাইঘাটবাসীর মনে দীর্ঘদিন বেদনার স্মৃতি হয়ে থাকবে। যে মানুষগুলো জীবনের সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন, তারা আর ফিরে এসে প্রিয়জনদের আলিঙ্গন করতে পারলেন না। তাদের অকাল মৃত্যু শুধু পাঁচটি পরিবারকেই শোকের সাগরে ভাসায়নি, বরং পুরো এলাকার মানুষকে গভীর বেদনায় স্তব্ধ করে দিয়েছে। এখন স্বজনদের একটাই প্রার্থনা—আল্লাহ যেন নিহতদের ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন এবং শোকাহত পরিবারগুলোকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দেন।


