প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় এক নারী তার দুই সন্তানকে নিয়ে টানা নয়দিন ধরে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ রয়েছেন। ঘটনাটি ঘিরে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগের পাশাপাশি নানা প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজির পাশাপাশি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং নিখোঁজদের সন্ধানে সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় রেখে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
নিখোঁজরা হলেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলার দক্ষিণ ভার্তখলা এলাকার বাসিন্দা আজাদ মিয়ার স্ত্রী জুলি বেগম (৩০), তাদের মেয়ে ফাবিহাতুন নেছা ফাইজা (১৬) এবং তিন বছর বয়সী ছেলে আজান আহমদ। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ জুন রাতে জুলি বেগম তার দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে পরিবারের কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি। মোবাইল ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
এ ঘটনায় জুলি বেগমের স্বামী আজাদ মিয়া দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ডায়েরিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২১ জুন রাতে তার অনুমতি ছাড়াই স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান। পরে বাসার আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত হন। এরপর আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি, সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থান এবং পরিচিতজনদের কাছে খোঁজ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি।
ডায়েরিতে আজাদ মিয়া আরও দাবি করেন, স্ত্রী জুলি বেগমের সঙ্গে তার কোনো ধরনের পারিবারিক বিরোধ, ঝগড়া বা মনোমালিন্য ছিল না। হঠাৎ করে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে চলে যাওয়ায় তিনি নিজেও বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশের মধ্যেই তারা বসবাস করছিলেন এবং এমন ঘটনার কোনো পূর্বলক্ষণ ছিল না।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, জুলি বেগমের বাবার বাড়ি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় হলেও বর্তমানে তার পরিবারের সদস্যরা নগরের উপশহর এলাকায় বসবাস করেন। নিখোঁজ হওয়ার পরপরই স্বজনরা সেখানে যোগাযোগ করেন। তবে জুলি বেগম কিংবা তার দুই সন্তান সেখানে যাননি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরপর বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন, পরিচিত ব্যক্তি এবং সম্ভাব্য গন্তব্যস্থলে খোঁজ নেওয়া হলেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ ডায়েরির ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করছেন দক্ষিণ সুরমা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মামুনুর রশীদ। তিনি জানান, ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে পুলিশ ইতোমধ্যে নিখোঁজ নারীর বাবার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে। পাশাপাশি উভয় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও হয়েছে। এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় জুলি বেগম ও তার সন্তানরা কোথায় অবস্থান করছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য অন্যান্য সূত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নিখোঁজ হওয়ার পেছনে পারিবারিক, সামাজিক বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট কারণ বা ঘটনার বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় এলাকাতেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রতিবেশীরা বলছেন, জুলি বেগমকে তারা সাধারণ একজন গৃহিণী হিসেবেই চিনতেন। হঠাৎ করে দুই সন্তানকে নিয়ে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তারাও বিস্মিত। অনেকেই আশা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত মা ও দুই সন্তানকে সুস্থ ও নিরাপদ অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা কখনোই হালকাভাবে নেওয়া হয় না। বিশেষ করে একজন নারী ও তার অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই সন্তান দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ থাকায় বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রয়োজন হলে আশপাশের জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বয় করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে প্রথম কয়েকটি দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্তকরণ এবং সম্ভাব্য সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ তদন্তকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে তারা গুজব বা যাচাইবিহীন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত না হয় এবং পরিবার অযথা মানসিক চাপে না পড়ে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ বা অপহরণের অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনুমান বা গুজব ছড়ানোর পরিবর্তে তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, যেকোনো তথ্য বা সূত্র পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিখোঁজ জুলি বেগম ও তার দুই সন্তানকে দ্রুত খুঁজে বের করার দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে তারা সাধারণ মানুষের কাছেও সহযোগিতা কামনা করেছেন। পরিবারের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং জনসাধারণের সহযোগিতার মাধ্যমে দ্রুত এই রহস্যের সমাধান হবে এবং মা ও দুই সন্তান নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে আসবেন।


