অনিয়মের অভিযোগে শ্রীমঙ্গলে ৪ কোটি টাকার সড়ককাজ বন্ধ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নে প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ টাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার প্রকল্পে অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজে অনুমোদিত মান বজায় রাখা হচ্ছে না এবং দায়িত্বশীল সংস্থার যথাযথ তদারকির অভাবে সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এলাকাবাসী চলমান আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ করে দেন এবং উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কালিঘাট-মনু-দলই সার্কুলার রোডের অংশ হিসেবে হোসনাবাদ-বিলাসছড়া সড়ক দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল। এই সড়কটি শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নয়, বরং সাতটি চা বাগান, তিনটি খাসিয়া পুঞ্জি এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রতিদিন এই পথে চা শিল্প সংশ্লিষ্ট ভারী যানবাহন, ট্রাক, জিপ, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ধরনের যান চলাচল করে। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও ফাটল তৈরি হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছিল। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে সড়কটি সংস্কারের জন্য ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।

উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে কাজ শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে যে, প্রকল্পে উন্নতমানের ভিটি বালু, পাথর ও খোয়া ব্যবহারের পরিবর্তে নিম্নমানের ইটের খোয়া, রাবিশ এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কাজের বিভিন্ন ধাপে প্রয়োজনীয় কমপ্যাকশন নিশ্চিত করা হয়নি এবং আরসিসি ঢালাইয়ের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত মান অনুসরণ করা হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রাস্তার পাশে পুরনো গাইডওয়াল মেরামতের নামে দায়সারাভাবে কাজ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরনো কাঠামোর ওপর নতুন ইটের পিলার নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে ইতোমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। এছাড়া রাস্তার পাশে বালু ও অল্প সিমেন্ট মিশ্রিত বস্তা ব্যবহার করায় বৃষ্টির পানিতে সেগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব অনিয়মের কারণে ভবিষ্যতে পুরো সড়কের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো কাজ পরিচালনা করছে। তাদের দাবি, প্রকল্পের শুরু থেকেই নির্ধারিত পরিমাণে রড, সিমেন্ট, সাদা পাথর ও উন্নতমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই সড়ক দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হোসনাবাদ পানপুঞ্জির মান্ত্রী ওয়েল সুরং বলেন, প্রকল্পের শুরু থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম চোখে পড়েছে। নিয়মিত তদারকি থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। তিনি দাবি করেন, কাজে নির্ধারিত মানের উপকরণ ব্যবহার না করায় নির্মাণের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে জনগণ এর ভোগান্তির শিকার হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন মিয়া বলেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পে যদি পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া ব্যবহার করা হয় এবং তা দেখার কেউ না থাকে, তাহলে এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন এলাকার বিনোদ তাঁতি, সঞ্জয় মুন্ডাসহ আরও অনেক বাসিন্দা। তাদের ভাষ্য, অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা নির্মাণকাজ বন্ধ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

এই সড়কে নিয়মিত যাত্রী পরিবহনকারী সিএনজি চালক নিশি ও রমজান মিয়া বলেন, প্রকল্পের ব্যয় বড় হলেও কাজের মানে তার প্রতিফলন নেই। তাদের মতে, এভাবে কাজ চলতে থাকলে কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কটি আবার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে। তারা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে সঠিক মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানান।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক জাফর আলী বলেন, তারা ঠিকাদারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছেন। কোন ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হবে বা প্রকল্পের কারিগরি শর্ত কী, সে বিষয়ে তাদের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সানি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. হাসানুজ্জামান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যে ইটের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে তা প্রকল্পের ‘সেলভেজ’ উপকরণের অংশ। টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী সরকার থেকে প্রায় ৭৫ লাখ টাকার বিনিময়ে এই সেলভেজ সামগ্রী তারা কিনেছেন এবং প্রকল্পে তা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুরনো কাঠামোর কিছু অংশে সমস্যা দেখা দিলেও প্রয়োজনীয় মেরামত করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যাতে রাস্তার পাশ ভেঙে না যায়, সে জন্য বালু ও সিমেন্টের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়েছে।

উপজেলা এলজিইডির কার্যসহকারী আবু বকর সিদ্দিক দাবি করেন, প্রকল্পের কাজ শিডিউল অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সেলভেজ উপকরণ ব্যবহারের কারণে কিছু ইটের মান তুলনামূলক কম হতে পারে।

একই বিষয়ে উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী সঞ্জয় পন্ডিত বলেন, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের একটি অংশ সেলভেজ বাবদ সরকারি তহবিলে জমা হবে। তিনি বলেন, সব কাজ নিম্নমানের হচ্ছে—এমন অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। তবে কাজের ক্ষেত্রে কিছু ত্রুটি থাকতে পারে এবং শতভাগ নিখুঁত কাজ হয়েছে বলাও সম্ভব নয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুর রাকিব বলেন, তিনি সময়ে সময়েই প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন। যদিও দৈনন্দিন তদারকির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলীর ওপর রয়েছে। তিনি জানান, অভিযোগের বিষয়ে পুনরায় সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করা হবে। যদি কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তা অপসারণ করে নতুনভাবে কাজ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান। ইউএনও বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পে প্রকৃত অনিয়ম চিহ্নিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সড়কটি নির্ধারিত মান বজায় রেখে নির্মাণ করা হবে। কারণ এই সড়ক শুধু একটি যোগাযোগপথ নয়, বরং চা বাগান, খাসিয়া পুঞ্জি এবং হাজারো মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি টেকসই ও মানসম্মত সড়ক নির্মাণই এখন এলাকাবাসীর প্রধান দাবি।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালুর দাবিতে সড়ক অবরোধ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জের বড়মোহায় স্কুল-মাদ্রাসার সড়ক পাকাকরণ কাজের উদ্বোধন

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে কফিনবন্দি ফিরলেন ৫ প্রবাসী, কানাইঘাটে শোকের মাতম

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নয়দিন ধরে নিখোঁজ মা ও দুই সন্তান, বাড়ছে রহস্য

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তীব্র গরমে হাঁসফাঁস, লোডশেডিংয়ে চুনারুঘাটে জনদুর্ভোগ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালুর দাবিতে সড়ক অবরোধ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে কফিনবন্দি ফিরলেন ৫ প্রবাসী, কানাইঘাটে শোকের মাতম

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নয়দিন ধরে নিখোঁজ মা ও দুই সন্তান, বাড়ছে রহস্য

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তীব্র গরমে হাঁসফাঁস, লোডশেডিংয়ে চুনারুঘাটে জনদুর্ভোগ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

যুক্তরাষ্ট্রের ভিসায় নতুন কড়াকড়ি, চাপে বাংলাদেশি আবেদনকারীরা

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ |সময়ের সন্ধান ডেস্ক | সময়ের...

সিলেটে সাইবার টিমের সাফল্য, মালিকের হাতে ৬৮ ফোন

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কাতার থেকে ফিরছে কানাইঘাটের পাঁচ প্রবাসীর মরদেহ

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ