প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ জেলা সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায় বন্যা, অতিবৃষ্টি এবং অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, সমন্বিত পরিকল্পনা ও স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নিয়ে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো, দ্রুত সাড়া প্রদান এবং ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সোমবার (২২ জুন) দুপুর ১২টায় দোয়ারাবাজার উপজেলা মডেল মসজিদের কনফারেন্স রুমে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইরা (ERA) এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের আর্থিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন প্ল্যান বাংলাদেশের প্রতিনিধি নিশাত আরা মীম। সভায় অংশগ্রহণকারীরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়ে মতামত প্রদান করেন।
সভা সঞ্চালনা করেন উপজেলা কৃষিবিদ কামরুল ইসলাম। প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ অঞ্চল প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। তাই দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি গ্রহণই ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তিনি বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক, সরকারি দপ্তর এবং স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দুর্যোগকালীন সময়ে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা এবং উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি যত শক্তিশালী হবে, দুর্যোগের ক্ষতি তত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন। তিনি নদ-নদীর পানি প্রবাহ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। পাশাপাশি নদীর পানি বৃদ্ধি, বাঁধের নিরাপত্তা এবং পানি প্রবাহের ওপর নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিভাগের অধ্যাপক আইশিয়া ফিরোজ আইশি সভায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আবহাওয়ার পরিবর্তিত ধারা এবং আগাম পূর্বাভাস ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আবহাওয়ার পূর্বাভাস স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারলে দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম কৃষিখাতের সম্ভাব্য ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি, বিকল্প ফসল চাষ এবং কৃষকদের সময়োপযোগী পরামর্শ প্রদানের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই কৃষকদের সহায়তায় কৃষি বিভাগের প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হচ্ছে।
সভায় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) লুৎফর রহমান দুর্যোগকালীন ত্রাণ ব্যবস্থাপনা, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী সংরক্ষণ, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনায় উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।
এ ছাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন কুমার সানা, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বিপ্রেশ তালুকদার, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাওলানা জয়নাল আবেদিন, বিআরডিবি কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য এশাদুর রহমান, হাসান আলী দুঃখুসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সভায় অংশগ্রহণ করেন। তারা নিজ নিজ দপ্তরের প্রস্তুতি, দায়িত্ব এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় করণীয় বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন।
সভায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলকে আরও কার্যকরভাবে প্রস্তুত করা, আশ্রয়কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত ও গতিশীল করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল প্রতিবছর বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণমূলক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো আগাম সতর্কতা, কার্যকর পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের জীবন, জীবিকা ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সভা শেষে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত সমন্বয় সভা, আগাম পরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীল কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অংশগ্রহণমূলক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়, যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।

