প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ফিফা বিশ্বকাপের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের দিকে। তবে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে মাঠে নামার আগেই ফুটবল ইতিহাসে নিজের নামের পাশে আরও একটি অনন্য কীর্তি যোগ করলেন লিওনেল মেসি। বয়স যেন তার কাছে কেবল একটি সংখ্যা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করে যাওয়া এই মহাতারকা এবার গড়লেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার রেকর্ড।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত প্রীতি ম্যাচটি হয় যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের জর্ডান-হেয়ার স্টেডিয়ামে। প্রায় ৮৮ হাজার দর্শকে পরিপূর্ণ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলের স্বস্তিদায়ক জয় পেলেও ম্যাচের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন মেসি। কারণ, এই ম্যাচেই তিনি ভেঙে দেন প্রায় সাত দশক ধরে অটুট থাকা একটি ঐতিহাসিক রেকর্ড।
ম্যাচের আগে মেসির শারীরিক অবস্থা নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সামান্য হ্যামস্ট্রিং সমস্যার কারণে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি তাকে শুরুর একাদশে রাখেননি। বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসর সামনে রেখে দলের সবচেয়ে বড় তারকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে চাননি কোচিং স্টাফ। ফলে বেঞ্চে বসেই ম্যাচের প্রথমার্ধ কাটান মেসি।
দ্বিতীয়ার্ধের ৬৯তম মিনিটে যখন তাকে মাঠে নামানো হয়, তখন পুরো স্টেডিয়াম করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাস যেন প্রমাণ করে দেয়, বয়স বাড়লেও ফুটবল বিশ্বে মেসির জনপ্রিয়তায় এতটুকুও ভাটা পড়েনি। মাঠে নামার পরপরই তার উপস্থিতিতে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে গতি ফিরে আসে। তার বল নিয়ন্ত্রণ, পাসের নিখুঁততা এবং খেলার ছন্দ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আবারও মুগ্ধ করে উপস্থিত দর্শকদের।
মাঠে নামার অল্প সময়ের মধ্যেই একটি আক্রমণের সূচনা করেন মেসি। তার বুদ্ধিদীপ্ত পাস থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে বক্সের মধ্যে ফাউলের শিকার হন স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজ। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালে স্পট কিক নিতে এগিয়ে আসেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ৭১তম মিনিটে ঠাণ্ডা মাথায় গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে পাঠান তিনি। সেই গোলেই আর্জেন্টিনা ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
তবে এটি ছিল কেবল একটি গোল নয়; এটি ছিল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। ৩৮ বছর ১১ মাস ১৮ দিন বয়সে গোল করে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোলদাতা হওয়ার কীর্তি গড়েন লিওনেল মেসি। এর আগে এই রেকর্ডটি ছিল কিংবদন্তি স্ট্রাইকার আনহেল আমাদেও লাব্রুনার দখলে। তিনি ১৯৫৭ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে রোকা কাপে ৩৮ বছর ৯ মাস ১০ দিন বয়সে গোল করেছিলেন। দীর্ঘ ৬৯ বছর ধরে অক্ষত থাকা সেই রেকর্ড অবশেষে ভাঙলেন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক।
মেসির ক্যারিয়ারে রেকর্ড যেন নিত্যসঙ্গী। আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনার হয়ে এটি ছিল তার ১১৭তম গোল। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে তিনি আগেই নিজের অবস্থান পোক্ত করেছিলেন। এবার সেই ব্যবধান আরও বাড়ালেন। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা কিংবদন্তি গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার গোলসংখ্যা ৫৫। অর্থাৎ বাতিস্তুতার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি আন্তর্জাতিক গোল এখন মেসির ঝুলিতে।
শুধু গোলের রেকর্ড নয়, ম্যাচ সংখ্যার আরেকটি বিরল মাইলফলকের দোরগোড়াতেও দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ১৯৯তম আন্তর্জাতিক উপস্থিতি। আগামী ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামলেই তিনি দেশের হয়ে ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার গৌরব অর্জন করবেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই কীর্তি গড়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা খুবই সীমিত।
এছাড়া বিশ্বকাপের মঞ্চেও নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ রয়েছে তার সামনে। বর্তমানে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার রেকর্ডটি রয়েছে মার্টিন পালের্মোর দখলে। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে গ্রিসের বিপক্ষে গোল করে তিনি এই কীর্তি গড়েছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল করতে পারলে সেই রেকর্ডও নিজের করে নেবেন মেসি।
লিওনেল মেসির ক্যারিয়ার যেন এক অবিরাম বিস্ময়ের গল্প। বার্সেলোনার এক কিশোর প্রতিভা থেকে শুরু করে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে ওঠা, কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতা, বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ জয় এবং একের পর এক ব্যক্তিগত রেকর্ড—সবকিছু মিলিয়ে তিনি ইতোমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন। তবু বয়সের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি যেন থামতে জানেন না। প্রতিটি ম্যাচে নতুন করে প্রমাণ করেন, প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা থাকলে সময়ও হার মানতে বাধ্য।
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু শিরোপা ধরে রাখার লড়াই নয়; এটি মেসির আরেকটি স্বপ্নযাত্রার সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষাও। ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে অপূর্ণতা ঘোচানোর পর এবার হয়তো তিনি খেলছেন নিজের উত্তরাধিকারকে আরও সমৃদ্ধ করতে।
আগামী ১৬ জুন আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে কোটি কোটি দর্শকের চোখ থাকবে একজন মানুষের দিকে। তিনি কি আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০০ ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করবেন? তিনি কি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতার রেকর্ডও নিজের করে নেবেন? নাকি আরও কোনো নতুন ইতিহাস লিখবেন নিজের বাম পায়ের জাদুতে?
উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়ে। তবে বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বাজার আগেই আরেকটি বিষয় নিশ্চিত হয়ে গেছে—লিওনেল মেসি এখনও ইতিহাস লেখার কাজ শেষ করেননি। বরং ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তিনি এখনও নতুন গল্পের জন্ম দিতে প্রস্তুত।

