প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের নগর উন্নয়ন, পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার নতুন অধ্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ হিসেবে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান লোদী, যিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে অধিক পরিচিত কয়েস লোদী নামে। সরকারের এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে সিলেটজুড়ে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং উন্নয়ন মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ এই নেতার হাত ধরেই সদ্য কার্যক্রম শুরু করতে যাওয়া সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভবিষ্যৎ কর্মপথ নির্ধারিত হতে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই নিয়োগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। উপসচিব মো. গোলাম রব্বানী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৩’-এর ধারা ৮(১) অনুযায়ী রেজাউল হাসান লোদীকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে তাকে অন্য যেকোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে বিদ্যমান কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে হবে। যোগদানের তারিখ থেকে তার নিয়োগ কার্যকর হবে এবং তিনি গ্রেড-২ মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়োগের অন্যান্য শর্তাবলি পৃথক চুক্তিপত্রের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
রেজাউল হাসান লোদী সিলেটের রাজনীতিতে সুপরিচিত একটি নাম। তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের একাধিকবার নির্বাচিত কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি প্যানেল মেয়র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। নগরবাসীর নানা সমস্যা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং সেবা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক পরিচয়ের দিক থেকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি পরিকল্পনা। দেশের অন্যতম পর্যটননগরী ও প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সিলেটে দ্রুত নগরায়ণ ঘটলেও সেই তুলনায় সমন্বিত ও পরিকল্পিত উন্নয়ন কাঠামোর অভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত ছিল। অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ, জলাবদ্ধতা, যানজট, খাল-ছড়া দখল, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং পর্যটন এলাকার অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে একটি স্বতন্ত্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই বছরের ২২ আগস্ট মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২২’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পর্যালোচনা শেষে ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয় ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০২৩’।
এই আইনের আওতায় সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকা এবং এর আশপাশের অঞ্চলকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে আবাসন উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণ, পর্যটন এলাকার আধুনিকায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলাধার রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে এই কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটের উন্নয়ন সম্ভাবনা যেমন ব্যাপক, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র রাতারগুল, জাফলং, বিছনাকান্দি, লালাখালসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসন সম্প্রসারণের কারণে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমন বাস্তবতায় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রথম দিকের কার্যক্রম এবং নেতৃত্বের দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, যদি যথাযথ পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তাহলে সিলেটকে দেশের অন্যতম আধুনিক, পরিবেশবান্ধব এবং বিনিয়োগবান্ধব নগরীতে পরিণত করা সম্ভব।
এদিকে কয়েস লোদীর নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন তার রাজনৈতিক সহকর্মী এবং সমর্থকরা। তাদের প্রত্যাশা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি সিলেটের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। অন্যদিকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে পারলে এই কর্তৃপক্ষ সিলেটের উন্নয়নে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
সাধারণ নাগরিকদের প্রত্যাশাও কম নয়। তারা চান, সিলেটের রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা নিরসন, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, খাল পুনরুদ্ধার এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পাক। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার ওপরও জোর দিচ্ছেন সচেতন মহল।
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে রেজাউল হাসান লোদীর সামনে যেমন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে, তেমনি বেড়েছে দায়িত্বও। কারণ, সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ এবং একটি পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে প্রচারিত তথ্য, জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের তথ্য পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও দায়বদ্ধতার নীতি অনুসরণ করে সংবাদটি উপস্থাপন করেছে “সময়ের সন্ধান অনলাইন”।


