প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
উজানের অব্যাহত বৃষ্টিপাতের প্রভাবে সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগাম বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে হাওড়াঞ্চলের কৃষকদের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জমির ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে দ্রুত ফসল কেটে নেওয়ার জন্য জরুরি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকেলে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেন সুনামগঞ্জ শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে উজান এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে নদ-নদীর পানির ওপর পড়তে শুরু করেছে। এতে করে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং পরিস্থিতি যেকোনো সময় আগাম বন্যায় রূপ নিতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদী, কুশিয়ারা নদী এবং বাউলাই নদীসহ অন্যান্য নদ-নদীর উজানে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এই বৃষ্টিপাতের ফলে নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পানি সমতল দ্রুত উপরে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে অল্প সময়ের মধ্যেই নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর–এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরও কয়েকদিন বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে করে হাওড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা, যেখানে বর্তমানে বোরো ধান প্রায় পেকে গেছে, সেখানে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সুনামগঞ্জের হাওড়াঞ্চল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদন অঞ্চল। প্রতি বছর এখানকার বোরো ফসল দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রায়ই আগাম বন্যার কারণে এই ফসল ক্ষতির মুখে পড়ে। চলতি মৌসুমেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক জমিতে ইতোমধ্যে ধান পেকে গেছে, তবে কিছু জমিতে এখনও পুরোপুরি পরিপক্ব হয়নি। এমন অবস্থায় হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পেলে ক্ষেত ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে করে কৃষকের বছরের পরিশ্রম মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এই বাস্তবতায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেসব জমির অন্তত ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ঘরে তোলার জন্য। এতে করে সম্ভাব্য ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদেরও কৃষকদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওড়াঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, উজানের পানি খুব দ্রুত এই অঞ্চলে প্রবেশ করে। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে বন্যা পরিস্থিতিতে রূপ নিতে পারে। তাই আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই একমাত্র উপায়। কৃষকদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং নদ-নদীর পানি সমতলের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে তারা মনে করছেন, প্রাকৃতিক এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়ভাবে অনেকেই আগের বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলছেন, হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধি পেলে সময়মতো ধান কাটার সুযোগ পাওয়া যায় না। ফলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় কৃষকদের। তাই এবার আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ায় তারা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, তবে যেকোনো সময় তা খারাপের দিকে মোড় নিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সবাই সচেতন থাকলে এবং সময়মতো ব্যবস্থা নিলে সম্ভাব্য ক্ষতি অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হবে।
উজানের বৃষ্টি এবং নদীর পানি বৃদ্ধির এই পরিস্থিতি শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি হাওড়াঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই প্রতিটি মুহূর্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ, আর এই সময়ের সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে কৃষকের ঘরে হাসি থাকবে, নাকি হতাশার ছায়া নেমে আসবে।


