প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা একটি ছোট কিন্তু সক্রিয় মাদকচক্রের পর্দাফাঁস করেছে র্যাব। অভিযানে পিতা ও পুত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে গোপনে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিল এই পরিবারটি, যা স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ ও শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছিল।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাতে সিলেটের গোয়াইনঘাট থানাধীন শালুটিকর বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। অভিযানে একটি প্লাস্টিকের বস্তা থেকে ৭১ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়, যা বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুদ করে রাখা হয়েছিল বলে জানায় র্যাব। বুধবার (২২ এপ্রিল) সকালে র্যাব-৯ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন সিলেটের বিমানবন্দর থানাধীন কালাগুল সাহেব বাজার এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম এবং তার ছেলে রাজা মিয়া। র্যাব জানায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে পরস্পরের সহযোগিতায় সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে অবৈধভাবে মাদক সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সংগঠিতভাবে মাদক সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রির মাধ্যমে একটি অবৈধ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন।
অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাদের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছিল। একপর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তারা শালুটিকর বাজার এলাকায় একটি চালানের মাধ্যমে মাদক সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এরপরই পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালিয়ে তাদের হাতেনাতে আটক করা হয়। উদ্ধারকৃত মদের বোতলগুলো বিদেশি ব্র্যান্ডের এবং এগুলোর বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।
র্যাবের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদক চোরাচালান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশি মদ, ইয়াবা ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য বিভিন্ন চক্রের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের চক্র ভাঙতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
গ্রেফতারের পর পিতা-পুত্রের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তীতে তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। উদ্ধারকৃত আলামতসহ তাদের গোয়াইনঘাট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকাটিতে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে মাদক ব্যবসা চলছিল বলে সন্দেহ ছিল। তবে প্রমাণের অভাবে কেউ সরাসরি কিছু বলতে সাহস পেতেন না। সাম্প্রতিক এই অভিযানের পর এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন অভিযান অব্যাহত থাকলে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিকভাবে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা, যা সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত বহন করে। পরিবারের সদস্যরা যখন নিজেরাই এই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা শুধু আইনি নয়, নৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও বড় ধরনের সংকট তৈরি করে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
র্যাব-৯ এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে তারা বদ্ধপরিকর। এই লক্ষ্যে সীমান্তবর্তী এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং সন্দেহভাজন চক্রগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তারা আরও বলেন, মাদক নির্মূলে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগ।
সিলেট অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় মাদক চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম সীমান্তপথ ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা সহজেই মাদক আনা-নেওয়া করে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা ও এর বিস্তারের বিষয়টি। সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাদকের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই অভিযানের মাধ্যমে একটি ছোট চক্র ধ্বংস হলেও, বৃহত্তর চিত্রে এটি একটি চলমান যুদ্ধের অংশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং জনসাধারণের সহযোগিতার মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে এ ধরনের অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় চক্র শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। এই ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।


