প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে অবৈধভাবে টিলা কেটে পরিবেশের ক্ষতিসাধনের দায়ে পৃথক দুটি অভিযানে দুই ব্যক্তিকে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা করেছে জেলা প্রশাসন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) গোলাপগঞ্জ উপজেলার ধারাবহর গ্রাম এবং সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর চৌমুহনী এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এ জরিমানা করা হয়। দুই অভিযানে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতি রক্ষায় টিলা কাটা বন্ধে প্রশাসনের এ অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়-টিলা সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ। একই সঙ্গে এসব ভূমি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, মাটির স্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু বসতবাড়ি নির্মাণ, জমির শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে অপরিকল্পিতভাবে টিলা কাটা হলে পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ধারাবহর গ্রামে প্রথম অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন গোলাপগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল মাহমুদ ফুয়াদ। সেখানে টিলা কেটে ঘর নির্মাণের দায়ে এক ব্যক্তিকে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এরপর একই দিন বিকেল ৩টার দিকে সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর চৌমুহনী এলাকায় দ্বিতীয় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিহাব সারার অভী। ওই এলাকায় টিলা কাটার অপরাধে আরেক ব্যক্তিকে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
দুটি অভিযানেই পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি ও শাহপরাণ (রহ.) থানা পুলিশের একটি দল সহযোগিতা করে। পৃথক স্থানে পরিচালিত এসব অভিযানের মাধ্যমে টিলা কাটা বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে।
সিলেট জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় টিলা কাটার বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। টিলা কাটা ও অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে প্রশাসন।
সিলেটের ভূপ্রকৃতিতে টিলার গুরুত্ব বহুমাত্রিক। এসব টিলা কেবল প্রাকৃতিক দৃশ্যের অংশ নয়; অনেক এলাকায় এগুলো স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবেও ভূমিকা রাখে। টিলার গাছপালা ও মাটির স্বাভাবিক গঠন বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে এবং ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। নির্বিচারে মাটি কেটে টিলার ঢাল পরিবর্তন করা হলে বৃষ্টির সময় মাটি ধসে পড়া, আশপাশের জমিতে পলি জমা এবং পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশেষ করে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি হলে কাটা টিলার ঢাল থেকে মাটি নেমে আসতে পারে। এতে আশপাশের বাড়িঘর, সড়ক ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টিলার পাদদেশে বসবাসকারী মানুষও নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তবে নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় এসব ক্ষতি ঘটেছে কি না, তা জানতে পৃথক পরিবেশগত ও ভূমিগত তথ্য প্রয়োজন।
টিলা কাটার পেছনে জমির ব্যবহার পরিবর্তন, বসতবাড়ি নির্মাণ এবং বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির মতো কারণ থাকতে পারে। কিন্তু উন্নয়ন বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ভূমির স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও পরিবেশগত বিধিনিষেধ মেনে চলা জরুরি। যথাযথ অনুমোদন ছাড়া টিলা কাটা হলে তা শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি করে না, বরং আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং আইন অনুযায়ী জরিমানা করার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো স্থানে টিলা কাটার ঘটনা ঘটলে দ্রুত তা শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে টিলা কাটা বন্ধে স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
পরিবেশ সংরক্ষণে শুধু জরিমানা আরোপ করলেই দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হবে না। কোথায় টিলা কাটা হচ্ছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত, জমির মালিকানা ও ব্যবহারের ধরন কী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় কী ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে—এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি টিলা সংরক্ষণসংক্রান্ত আইন সম্পর্কে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা এবং আইন লঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া জরুরি।
সিলেটের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় টিলা সংরক্ষণের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বসতবাড়ি নির্মাণ কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে জমির ব্যবহার পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করা উচিত। টিলা কাটা বা পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে—এমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়লে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোও পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
গোলাপগঞ্জের ধারাবহর ও খাদিমনগর চৌমুহনী এলাকায় পৃথক অভিযানে দুই ব্যক্তিকে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা করার ঘটনা সিলেটে টিলা সংরক্ষণের প্রশ্নটি আবারও সামনে এনেছে। প্রশাসন অভিযান আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে। এখন নিয়মিত নজরদারি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টিলা কাটা বন্ধে কতটা অগ্রগতি আসে, সেটিই দেখার বিষয়। সিলেটের প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।


