প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নতুন কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব হিসেবে আখতার হোসেন নিজ নিজ পদে বহাল রয়েছেন। অন্যদিকে, সিলেট অঞ্চলের রাজনীতিতে পরিচিত তিন নেতা এহতেশাম হক, প্রীতম দাশ ও কামরুল আরিফ নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এহতেশাম হক ও প্রীতম দাশকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। আর সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন কামরুল আরিফ।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দলের ফেসবুক পোস্টে পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়। নতুন কমিটিতে একাধিক শীর্ষ নেতার পদ ও দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নতুন বিন্যাস তৈরি হয়েছে, যেখানে নীতিনির্ধারণী ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব বিভিন্ন নেতার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
এনসিপি গঠনের পর এটিকে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করা, দেশজুড়ে সাংগঠনিক বিস্তার বাড়ানো এবং তৃণমূল পর্যায়ে কার্যক্রম জোরদারের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। নতুন কমিটির মাধ্যমে সেই উদ্যোগকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
সিলেটের এহতেশাম হক আগের কমিটিতেও যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। পুনর্গঠিত কমিটিতে তিনি একই পদে বহাল রয়েছেন। তবে তাঁর দায়িত্বের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। আগে তিনি দলের সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলেও নতুন কমিটিতে সেই পদে আর থাকছেন না। তাঁর পরিবর্তে দায়িত্ব পেয়েছেন সিলেট জেলা কমিটির সদস্যসচিব কামরুল আরিফ।
অন্যদিকে, প্রীতম দাশ আগের কমিটিতে যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নতুন কমিটিতে তাঁকে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে উন্নীত করা হয়েছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মৌলভীবাজার-৪ আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। নতুন দায়িত্বের মাধ্যমে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তাঁর অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে।
এহতেশাম হক ও প্রীতম দাশের যুগ্ম আহ্বায়ক পদে বহাল থাকা এবং পদোন্নতির বিষয়টি সিলেট অঞ্চলের নেতাদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে কামরুল আরিফের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া আঞ্চলিক সংগঠন পরিচালনায় নতুন নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এসব পরিবর্তনের ফলে সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে কী ধরনের বাস্তব পরিবর্তন আসে, তা নির্ভর করবে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের পরিকল্পনা, সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের ওপর।
কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। নাহিদ ইসলাম আহ্বায়ক এবং আখতার হোসেন সদস্যসচিব পদে বহাল রয়েছেন। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আব্দুল্লাহ। এর আগে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দলের মুখ্য সমন্বয়ক এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
অন্যদিকে, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়েছে। সারজিস আলম আগে মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) এবং আসিফ মাহমুদ দলের মুখপাত্রের দায়িত্বে ছিলেন। নতুন কাঠামোয় তাঁদের পদ পরিবর্তনের পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দায়িত্ব বণ্টনের নতুন পদ্ধতি কার্যকর হয়েছে।
দলের আরেক নেতা সামান্তা শারমিন আগে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। পুনর্গঠিত কমিটিতে তিনি যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে রয়েছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট করার বিষয়ে তাঁর আপত্তি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই নির্বাচনে তিনি অংশ নেননি। তবে নতুন কমিটিতে তাঁর পদ পরিবর্তনের পেছনে দলীয় সিদ্ধান্তের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা প্রকাশিত তথ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে দলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ১৩ অক্টোবর বিডিনিউজ২৪ডটকমের এক প্রতিবেদনে শীর্ষ নেতৃত্বে রদবদলের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। পরদিন দ্য ডেইলি স্টারও জানায়, তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কার্যক্রমকে সামনে রেখে কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনের নিজ নিজ পদে বহাল থাকা এবং কয়েকজন শীর্ষ নেতার দায়িত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিল। শুক্রবার প্রকাশিত কমিটিতে সেই পরিবর্তনগুলোর প্রতিফলন দেখা যায়।
এনসিপির জন্ম জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায়। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রত্যাশা সামনে রেখে দলটি যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠার পর জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দেয় দলটি। নতুন কমিটির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব আরও সুস্পষ্ট করা এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক শক্তি শুধু কেন্দ্রীয় কমিটির পদবিন্যাসের ওপর নির্ভর করে না। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত কার্যক্রম, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কমিটি ঘোষণার পর নেতাদের সামনে এখন এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সিলেট বিভাগের জন্যও নতুন দায়িত্ব বণ্টন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কামরুল আরিফের দায়িত্ব হবে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ও স্থানীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় কাঠামো সক্রিয় রাখা, নেতাকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগঠনের কর্মসূচির সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা তাঁর দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এহতেশাম হক ও প্রীতম দাশের জন্যও নতুন কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দলীয় সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে তাঁদের ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তাঁদের পরিচিতি দলীয় কার্যক্রমে কতটা কাজে আসে, তা ভবিষ্যতে স্পষ্ট হবে।
সব মিলিয়ে, এনসিপির পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি দলটির সাংগঠনিক যাত্রায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। শীর্ষ নেতৃত্বে কয়েকজনের পদোন্নতি, দায়িত্বের পুনর্বণ্টন এবং সিলেটের তিন নেতার গুরুত্বপূর্ণ পদে আসা এই পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য দিক। এখন নতুন কমিটির কার্যক্রম, সাংগঠনিক বিস্তার এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বোঝা যাবে, এই পুনর্গঠন দলটিকে কতটা গতিশীল করতে পারে।


