প্রকাশ: ৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী মহালয়া উৎসব। শরতের আবহে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা, মাতৃসংগীত, সমবেত গীতাপাঠ ও নানা ধর্মীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসবটি উদযাপন করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং মানবিক কর্মসূচির সমন্বয়ে আয়োজিত এ উৎসব ঘিরে নগরীতে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্টের উদ্যোগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। উদ্বোধন করেন রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রম সিলেটের সম্পাদক ও অধ্যক্ষ চন্দ্রনাথানন্দ। মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালন ও বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। পরে উদ্বোধনী সংগীত ও সমবেত গীতাপাঠে অংশ নেয় শিশু-কিশোররা।
মাতৃসংগীত, উদ্বোধনী সংগীত এবং ধর্মীয় পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মহালয়ার তাৎপর্য তুলে ধরা হচ্ছে। দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে ভক্তদের মধ্যে যে প্রত্যাশা ও আবেগ তৈরি হয়, এসব আয়োজনের মাধ্যমে তা প্রকাশ পাচ্ছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরার সুযোগ হিসেবেও এ উৎসবকে দেখছেন আয়োজকেরা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত আচার অনুযায়ী, মহালয়া দেবীপক্ষের সূচনার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের আগমনকে ঘিরে এ দিন দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের প্রতীক্ষা শুরু হয়। দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও আবহ তৈরিতে মহালয়ার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
মহালয়া মূলত দেবী দুর্গার আবাহন এবং অশুভ শক্তির বিনাশের মধ্য দিয়ে শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত। দেবী দুর্গাকে শক্তি, সাহস ও ন্যায়ের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করেন ভক্তরা। ধর্মীয় কাহিনি ও প্রচলিত বিশ্বাসে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবীর বিজয় অন্যায় ও অশুভ শক্তির পরাজয় এবং ন্যায় ও কল্যাণের প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
শরতের নীল আকাশ, সাদা কাশফুল এবং উৎসবের প্রস্তুতি বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দুর্গোৎসবের আগমনী আবহ তৈরি করে। মহালয়ার মধ্য দিয়ে সেই আবহ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেকের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং শৈশবের স্মৃতি, পারিবারিক বন্ধন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক মিলনেরও একটি উপলক্ষ।
সিলেটের মতো সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলে মহালয়া উদযাপন ধর্মীয় ঐতিহ্য চর্চার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন বয়সের মানুষের অংশগ্রহণে এমন আয়োজন প্রজন্মের মধ্যে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংযোগ তৈরি করে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এবারের মহালয়া উৎসবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন রাখা হয়েছে। চিত্রাঙ্কন, গীতাপাঠ, চণ্ডীপাঠ এবং ধর্মীয় গল্পবলা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উৎসবকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে গীতাপাঠ ও চণ্ডীপাঠের আয়োজন ধর্মীয় শিক্ষা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আগ্রহ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। ধর্মীয় গল্পবলার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রচলিত আখ্যান, মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হবে।
শিশু-কিশোরদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এ ধরনের আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যখন তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তখন উৎসব কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং শেখা, সৃজনশীলতা ও পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও পরিণত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের সংগীত পরিবেশনা ও সমবেত গীতাপাঠে অংশগ্রহণ সেই ধারারই প্রতিফলন। উৎসবের আয়োজনে তাদের সম্পৃক্ততা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চর্চা অব্যাহত রাখতে সহায়ক হতে পারে।
মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্টের আয়োজনে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচির পাশাপাশি মানবিক কার্যক্রমও রাখা হয়েছে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং রক্তদান কর্মসূচি এবারের উৎসবের উল্লেখযোগ্য অংশ।
শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে আর্থিকভাবে অসচ্ছল অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মানুষের সম্ভাবনা বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত না হয়, সে ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
একইভাবে রক্তদান কর্মসূচি সমাজের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক দায়িত্ববোধের বার্তা বহন করে। জরুরি চিকিৎসায় রক্তের প্রয়োজন হলে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের অবদান অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উৎসবের সঙ্গে এমন কর্মসূচির সংযোগ ধর্মীয় চর্চার পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে কাজ করার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে আসে।
ধর্মীয় উৎসব সাধারণত মানুষের মধ্যে আনন্দ, একাত্মতা ও পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা সহায়তা ও রক্তদানের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে উৎসবের সামাজিক তাৎপর্য আরও বিস্তৃত হয়। তবে এসব কর্মসূচির মাধ্যমে কতজন শিক্ষার্থী উপকৃত হবেন কিংবা রক্তদান কার্যক্রমে কতজন অংশ নেবেন, সে বিষয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান জানানো হয়নি।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিলেটে মহালয়া উদযাপনের এ আয়োজন প্রায় তিন যুগ ধরে চলে আসছে। দীর্ঘ সময় ধরে আয়োজনটি অব্যাহত থাকা স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চর্চার ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে।
একটি উৎসব দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকার পেছনে আয়োজক, অংশগ্রহণকারী, স্বেচ্ছাসেবক এবং শুভানুধ্যায়ীদের সম্মিলিত ভূমিকা থাকে। প্রতিবছর নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পুরোনো ঐতিহ্য নতুনভাবে পরিচিত হয়। একই সঙ্গে সময়ের সঙ্গে উৎসবের আয়োজনেও যুক্ত হতে পারে নতুন কর্মসূচি ও সামাজিক উদ্যোগ।
মহালয়া উদযাপন পরিষদ শ্রীহট্টের এবারের আয়োজনেও ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা এবং মানবিক কর্মসূচিকে একসঙ্গে রাখা হয়েছে। এতে উৎসবের পরিসর কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও বয়সের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির চেষ্টা দেখা যায়।
মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজাকে ঘিরে অপেক্ষা ও প্রস্তুতির আবহ আরও ঘন হয়ে ওঠে। মণ্ডপ প্রস্তুত, প্রতিমা নির্মাণ, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং পারিবারিক পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের দিনগুলোকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি চলে। মহালয়ার অনুষ্ঠান সেই প্রস্তুতির আবেগঘন সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সিলেটে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এ উৎসবেও ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। মাতৃসংগীত, গীতাপাঠ, চণ্ডীপাঠ ও অন্যান্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার মাহাত্ম্য স্মরণ করার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ত করা এবং মানবিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
উৎসবের মূল বার্তায় রয়েছে অশুভের বিরুদ্ধে শুভের প্রত্যাশা, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের কল্যাণ কামনা। ধর্মীয় বিশ্বাসের নিজস্ব পরিসর অতিক্রম করে এসব মূল্যবোধ সমাজে সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চাকে উৎসাহিত করতে পারে।
সিলেটে মহালয়া উদযাপনের এই আয়োজন তাই শুধু দুর্গোৎসবের আগমনী অনুষ্ঠান নয়; স্থানীয় ঐতিহ্যকে ধারণ, নতুন প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক চর্চায় যুক্ত করা এবং সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি সম্মিলিত উদ্যোগ হিসেবেও গুরুত্ব বহন করছে। আগামী দিনগুলোতে নির্ধারিত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উৎসবের আয়োজন এগিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।


