প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হত্যাচেষ্টার আলোচিত মামলায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারক স্বপন কুমার সরকারের আদালতে এ কার্যক্রম শুরু হয়। মামলার এই পর্যায়কে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বহু বছর ধরে বিচারাধীন এই ঘটনাটি, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলায় অভিযুক্ত ১০ জনের মধ্যে ছয়জন বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন। বাকি আসামিদের মধ্যে তিনজন জামিনে এবং একজন পলাতক। তবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের প্রথম দিনে জেলহাজতে থাকা আসামিদের বাইরে অন্য কেউ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি আদালত এবং সংশ্লিষ্ট মহলে কিছুটা বিস্ময়েরও জন্ম দিয়েছে।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামিপক্ষ উভয়ই তাদের প্রাথমিক যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি এখন গুরুত্বপূর্ণ এই ধাপে পৌঁছেছে। আদালত প্রথম দিনের কার্যক্রম শেষে পরবর্তী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী ২৭ এপ্রিল তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
এর আগে ৭ এপ্রিল একই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য জানতে চান বিচারক। সে সময় শুনানিতে অংশ নিয়ে অভিযুক্তদের মধ্যে আরিফুল হক চৌধুরী, জি কে গউছ এবং লুৎফুজ্জামান বাবর নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তাদের পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে বলেন, সংশ্লিষ্ট ঘটনার সঙ্গে তাদের মক্কেলদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তারা রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন।
মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি আবুল হোসেন জানান, বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রথম দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন। আমরা আশা করছি, নিয়মিত শুনানির মাধ্যমে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির দিকে এগোবে।”
অন্যদিকে, আরিফুল হক চৌধুরীর আইনজীবী এমদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম বলেন, তার মক্কেল সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত নন। তিনি আদালতে তার পক্ষে বিস্তারিত যুক্তি উপস্থাপন করেন এবং বলেন, “এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, যেখানে প্রকৃত ঘটনা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।”
এই মামলার পেছনের ঘটনাপ্রবাহ দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। হঠাৎ করে সমাবেশস্থলে গ্রেনেড বিস্ফোরণ হলে ঘটনাস্থলেই যুবলীগের এক কর্মী নিহত হন এবং অন্তত ২৯ জন আহত হন। ওই হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
ঘটনার পরপরই দিরাই থানার উপপরিদর্শক হেলাল উদ্দিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর আদালত লুৎফুজ্জামান বাবর, আরিফুল হক চৌধুরীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন এবং বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। সেই থেকে ধাপে ধাপে সাক্ষ্যগ্রহণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষে এখন মামলাটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এদিকে একই দিনে আলোচিত আরেকটি মামলার কার্যক্রমেও অগ্রগতি থমকে গেছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলায় নির্ধারিত সাক্ষী উপস্থিত না থাকায় এদিন সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হয়নি। সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের একই বিচারক এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ১৯ মে নির্ধারণ করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, তৎকালীন সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মেহেরুন নেছা পারুলের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় শুনানি স্থগিত করতে বাধ্য হন বিচারক।
২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে এক জনসভা শেষে বের হওয়ার পথে গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হন শাহ এ এম এস কিবরিয়া। পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। ওই হামলায় তার ভাতিজাসহ আরও চারজন নিহত হন এবং অন্তত ৭০ জন আহত হন। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।
এই দুটি মামলাই দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন এবং দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হত্যাচেষ্টা মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হওয়ায় এখন মামলার চূড়ান্ত রায়ের দিকে নজর রয়েছে সবার। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তিতর্কের এই পর্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই উভয় পক্ষ তাদের সব যুক্তি ও প্রমাণের সারসংক্ষেপ আদালতের সামনে তুলে ধরে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হলে দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তাও যাবে।


