প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় আকস্মিক ঝড়ের সময় সড়কে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে এক গ্রামীণ ব্যাংক কর্মকর্তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহত ব্যক্তি সেবুল আহমেদ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে একজন সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাতের এই দুর্ঘটনাটি ঘটে তেমুখী বাইপাস সড়কে। দিনভর আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকেই আকাশে মেঘ জমতে শুরু করে এবং রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করেই ঝড়ো হাওয়ার তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। স্থানীয়রা জানান, ঝড়টি ছিল অত্যন্ত আকস্মিক ও প্রবল, যার কারণে অনেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাননি।
নিহত সেবুল আহমেদ বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের ইশবপুর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবার ও কর্মস্থলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল এবং সবার কাছে প্রিয় একজন মানুষ। তার মৃত্যুতে পরিবার যেমন শোকাহত, তেমনি সহকর্মী ও এলাকাবাসীর মধ্যেও গভীর দুঃখ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সময় সেবুল আহমেদ তেমুখী বাইপাস সড়ক দিয়ে নিজ গন্তব্যে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে শুরু হওয়া প্রবল ঝড়ের মধ্যে একটি বড় গাছের ডাল ভেঙে সরাসরি তার মাথার ওপর পড়ে। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই গুরুতর অবস্থায় পড়ে যান। আশপাশের লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে সিলেট নগরের আখালিয়ায় অবস্থিত মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে নিয়ে যান।
হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তার অবস্থার অবনতি দেখতে পান এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও রাত প্রায় ১২টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার এই মৃত্যু পরিবার ও স্বজনদের জন্য ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত ও মর্মান্তিক।
নিহতের শ্যালক মঈন উদ্দিন আহমদ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঝড়ের সময় গাছের ডাল ভেঙে পড়ে সেবুল আহমেদ গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তিনি আরও বলেন, “আমরা কেউ ভাবিনি এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছে যে আমরা তাকে বাঁচানোর সুযোগই পাইনি।”
এই ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভও লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, সড়কের পাশে থাকা পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো নিয়মিতভাবে ছাঁটাই বা অপসারণ করা হয় না। ফলে ঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এসব গাছ বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিতভাবে গাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, বিশেষ করে যেসব গাছ দুর্বল বা সহজেই ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
এদিকে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়টিতে দেশে কালবৈশাখী ধরনের ঝড়ের প্রবণতা বেড়ে যায়। হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাত এবং ভারী বৃষ্টিপাত মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে অপ্রয়োজনে বাইরে না বের হওয়া এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সেবুল আহমেদের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির অভাবের একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে সড়কের পাশে গাছপালা ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো চিহ্নিতকরণ এবং দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়গুলো এখন আরও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সেবুল আহমেদ ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের প্রতি তাদের আহ্বান, যেন এই দুর্ঘটনার যথাযথ তদন্ত করা হয় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এলাকাবাসীও একই দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, সড়কের পাশের ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো দ্রুত অপসারণ করা হোক এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা হোক, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন মর্মান্তিক ঘটনার মুখোমুখি হতে না হয়।
এই ঘটনায় বিশ্বনাথসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কর্মস্থলে সহকর্মীরা তাকে স্মরণ করছেন একজন পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ হিসেবে, আর পরিবারে তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক ও স্নেহশীল সদস্য। তার এই অকাল মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটি অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রকৃতির এই অনিয়ন্ত্রিত রূপ এবং মানবিক অবহেলার সম্মিলিত ফলাফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সেবুল আহমেদের মৃত্যু তারই একটি বেদনাদায়ক উদাহরণ হয়ে রইল।


