প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) পরিচ্ছন্নতাকর্মী হৃদয় কুমার হরিজন হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিহতের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। নিহত হৃদয় কুমারের আজীবন আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন হরিজন ঐক্য কল্যাণ পরিষদের নেতারা। তাঁদের দাবি, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চার সন্তানসহ স্বজনেরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবারটির ভরণপোষণ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং ন্যূনতম জীবনযাপনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে।
শুক্রবার সিলেট নগরের সিটি পয়েন্টে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সমাবেশে নিহতের স্বজন, হরিজন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। বক্তারা হৃদয় কুমার হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, মামলার সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে তাঁরা বলেন, একজন শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারের জীবিকা বন্ধ হয়ে গেলে সেই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব রয়েছে।
হরিজন ঐক্য কল্যাণ পরিষদ সিলেট জেলা শাখার সভাপতি সুজন বাঁশফোরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সিলেট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. ছাদেক মিয়া। এতে বক্তব্য দেন নিহত হৃদয় কুমারের ছোট বোন নূপুর বাঁশফোর, স্ত্রী পিংকি বাঁশফোর, হরিজন ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সহসভাপতি জাফরু বাঁশফোর, সাধারণ সম্পাদক রাজু লাল, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সেহেলী রানী বাঁশফোর এবং সন্দীপ বাঁশফোর।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ সিলেট জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, যুগ্ম সম্পাদক রমজান আলী পটু ও কোষাধ্যক্ষ আব্দুস সালামসহ অন্য নেতারা। বক্তারা হৃদয় কুমারের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবি জানান এবং তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, হৃদয় কুমার চার সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করতেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করে তিনি পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করতেন। তাঁর উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল ছিল পরিবারের সদস্যদের খাবার, চিকিৎসা, বাসস্থান ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটি একদিকে প্রিয়জন হারানোর শোক বহন করছে, অন্যদিকে দৈনন্দিন জীবন চালানোর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
নিহতের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য ও সংগঠনের নেতাদের দাবিতে উঠে এসেছে, হৃদয় কুমারের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের উপার্জনের পথ বন্ধ করেনি, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে চার সন্তানের লালন-পালন, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব এখন কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়ে বক্তারা বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বক্তাদের অভিযোগ, গত ১১ অক্টোবর রাতে হৃদয় কুমারকে তাঁর স্ত্রীর ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় ইমন, আমিনসহ কয়েকজন জড়িত বলে সমাবেশে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। বক্তারা দাবি করেন, ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি যথাযথভাবে তদন্ত করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সমাবেশ থেকে আরও বলা হয়, অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তাঁদের মতে, শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সমাজের সামগ্রিক দায়িত্ব। কর্মজীবী কোনো ব্যক্তি সহিংসতার শিকার হলে তাঁর পরিচয়, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বক্তারা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা বজায় রাখারও আহ্বান জানান।
এদিকে হৃদয় হরিজন (৩৩) হত্যা মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানা। পুলিশ জানিয়েছে, নরসিংদীর মাধবদী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ইমন আহমেদ (২৬), রুমান আহমদ সাজ্জাদ (২৫) এবং পারভেজ (২২)। মামলার প্রধান আসামি মো. আমিন আহমদ (৩৫) পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শুক্রবার বিকেলে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদ শামীম। তিনজনকে গ্রেপ্তারের খবর মামলার তদন্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে সামনে এসেছে। তবে মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, ঘটনার সঙ্গে প্রত্যেক অভিযুক্তের সম্পৃক্ততা যাচাই এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের মধ্য দিয়েই অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হবে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৭টার দিকে সিলেট নগরের কাষ্টঘর সুইপার কলোনি এলাকায় হৃদয় হরিজনকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের কারণ, এতে কারা জড়িত এবং কী পরিস্থিতিতে মারধরের ঘটনা ঘটেছিল, তা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন দেখা দেয়।
প্রতিবাদ সমাবেশে ক্ষতিপূরণের যে দাবি তোলা হয়েছে, তা নিহতের পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। আজীবন আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের সম্ভাব্য কর্মজীবন, আয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং নির্ভরশীলদের ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের মতো বিষয় বিবেচনার প্রয়োজন হতে পারে। তবে ক্ষতিপূরণের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, অর্থের উৎস এবং কোন কর্তৃপক্ষ কীভাবে তা প্রদান করবে, সে বিষয়ে সমাবেশে উত্থাপিত দাবির বাইরে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিবারের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের আকস্মিক মৃত্যুতে অনেক সময় তাৎক্ষণিক সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কার্যকর সহায়তা না পেলে শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের আরও অনিশ্চিত জীবিকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
হরিজন সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিরাপত্তা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং সামাজিক মর্যাদা নিয়েও সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া হয়। বক্তারা মনে করেন, হৃদয় কুমার হত্যার বিচার শুধু তাঁর পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; কর্মক্ষেত্র ও বসবাসের এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নের সঙ্গেও এটি যুক্ত। তবে ঘটনার পেছনে কোনো সামাজিক বৈষম্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
হৃদয় কুমার হত্যার ঘটনায় এখন একদিকে মামলার তদন্ত ও পলাতক প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোও জরুরি। গ্রেপ্তার তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং পরিবারের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি—সবকিছুই পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিহতের স্বজন ও সংগঠনের নেতারা দ্রুত বিচার এবং আর্থিক সহায়তার যে দাবি জানিয়েছেন, তার বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের দিকে এখন নজর থাকবে। হৃদয় কুমারের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের জীবনযাপনের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা গেলে এই মর্মান্তিক ঘটনার পর তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।


