প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশকে অস্থিতিশীল করতে পরাজিত শক্তি পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে উসকানি দিচ্ছে এবং শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তাঁর দাবি, চলমান শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে নানা ধরনের উসকানি দেওয়া হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ও অসন্তোষের বিষয়টি রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে এক করে না দেখে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে সিলেট নগরীর দরগাহ গেইট এলাকার একটি অভিজাত হোটেলের কনফারেন্স হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন রুহুল কবির রিজভী। সিলেটে তাঁর এক দিনের সফরের অংশ হিসেবে আয়োজিত এ মতবিনিময় সভায় দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শ্রমিক অসন্তোষ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেন।
রিজভী বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য পরাজিত শক্তি পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বিভিন্নভাবে উসকানি দিচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনে কারা রয়েছে, তা খুঁজে বের করার জন্য সংশ্লিষ্টদের আরও গভীরভাবে বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন চলছে। সোমবারও পোশাকশ্রমিকদের চলমান অসন্তোষ নিরসনে মালিকপক্ষের সঙ্গে সরকারের বৈঠক হয়েছে। একই সময়ে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের খবর পাওয়া গেছে। ফলে শ্রমিকদের দাবি, শিল্প খাতের স্বাভাবিকতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—তিনটি বিষয়ই বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
রিজভী তাঁর বক্তব্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে কেউ চোরাপথে বা পেছনের দরজা দিয়ে দেশে প্রবেশের চেষ্টা করলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে নাশকতা বা ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নতুন করে কেউ জড়িয়ে পড়ছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা দরকার। এ ক্ষেত্রে শুধু দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড নয়, এর পেছনে কোনো সংগঠিত পরিকল্পনা বা অন্য কোনো পক্ষের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ অবশ্য রিজভীই শুধু করেননি। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকেও আন্দোলনের আড়ালে অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার শ্রমিকদের দাবি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে। সোমবার শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়ানোর দাবি সামনে এসেছে। ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের পক্ষের প্রতিনিধিরাও চলমান পরিস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণ এবং আটক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছেন। ফলে শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে প্রকৃত অর্থনৈতিক ও কর্মক্ষেত্রের সমস্যাগুলোও আলোচনায় রয়েছে।
সিলেটের মতবিনিময় সভায় রিজভী জামায়াতে ইসলামীর আমিরের ‘আরেকটি বিপ্লবের অপেক্ষা’ সংক্রান্ত বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, মাত্র আট মাসের একটি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তাঁর মতে, সংসদে বসে আলোচনা না করে যারা লংমার্চের ডাক দিচ্ছেন, তারা দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে উৎসাহিত করছেন কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে রিজভীর এসব বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ হিসেবে এসেছে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বক্তব্য ছাড়া এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দলের বক্তব্য, কর্মসূচি ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে।
মতবিনিময় সভায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন বিএনপির এই নেতা। তিনি জানান, এবার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হচ্ছে না। তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে দলের নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা এবং প্রস্তুতিমূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে বিএনপির পক্ষ থেকেও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নির্বাচনী পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে রিজভীর বক্তব্যে উঠে আসে।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাধারণত তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কেন্দ্রীয় রাজনীতির পাশাপাশি ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা কিংবা অন্যান্য স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও নেতৃত্বের অবস্থানও এ ধরনের নির্বাচনে সামনে আসে। ফলে দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি ও অবস্থান নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সিলেটের মতবিনিময় সভায় জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ছাড়াও দলের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রিজভীর সিলেট সফরকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও ছিল আগ্রহ। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর এটি তাঁর সিলেটে প্রথম সফর বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক অসন্তোষ, মজুরি নিয়ে দাবি, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মজুরি নিয়ে বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে, অন্যদিকে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নাশকতা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতার অভিযোগও উঠছে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রিজভীর বক্তব্যে মূলত শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এবং দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রস্তুতির কথাও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হলেও শ্রমিক অসন্তোষের প্রকৃত কারণ এবং এর সমাধান নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সংলাপই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামনে আরও কীভাবে এগোয় এবং শ্রমিকদের চলমান দাবি-দাওয়া কীভাবে সমাধানের দিকে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যের পাশাপাশি শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক দাবিগুলোর সমাধান এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাই পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।


