প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ শনিবার ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ নামে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে। নতুন কাঠামোতে মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ধাপে ধাপে এর বাস্তবায়নের সময়সূচিও নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি ছিল—বর্ধিত বেতন ঠিক কবে থেকে হাতে পাওয়া যাবে—প্রজ্ঞাপনে তার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তবে সিদ্ধান্তটি একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত সম্পূর্ণ মূল বেতন পেতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছর থেকেই বাড়তি মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর হবে এবং পরবর্তী সময়ে সেই অংশের পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে।
চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতনকাঠামোয় নির্ধারিত বাড়তি মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। একই সময়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বাড়তি মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে। এই বাড়তি অর্থ ৩০ জুনে আহরিত বা প্রাপ্য বেতনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে নতুন কাঠামোর প্রথম ধাপেই বিভিন্ন গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীরা আগের তুলনায় বর্ধিত বেতন পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে প্রথম ধাপে বর্ধিত বেতনের পুরোটা পাওয়া যাবে না। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ কার্যকর হবে। একই সময়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বাড়তি মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
এরপর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামোয় নির্ধারিত সম্পূর্ণ মূল বেতন কার্যকর হবে। অর্থাৎ নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে বেতন সমন্বয় করা হবে। এতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর একসঙ্গে বড় ধরনের চাপ তৈরি না করে পর্যায়ক্রমে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বকেয়া বেতন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন বেতনকাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ায় ওই তারিখ থেকে প্রাপ্য বর্ধিত বেতনের বকেয়া অর্থও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া হবে। ফলে প্রজ্ঞাপন জারির পর শুধু ভবিষ্যতের বেতন নয়, কার্যকর তারিখ থেকে প্রাপ্য বর্ধিত অংশের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে বকেয়া অর্থ ঠিক কোন পদ্ধতিতে, কত কিস্তিতে বা কোন সময়সূচিতে পরিশোধ করা হবে—তা বাস্তবায়নসংক্রান্ত পরবর্তী নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
নতুন কাঠামোয় শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা রয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন বেতনকাঠামোর অন্যান্য সব ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। একই সময় থেকে পেনশনভোগীরাও নতুন বেতনকাঠামোর সব সুবিধা পাওয়ার কথা রয়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেলের প্রভাব শুধু বর্তমানে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে।
প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরির বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। ১ম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্যদিকে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা রয়েছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভাতাও আনুপাতিক হারে বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের মাসিক আয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে।
নতুন বেতনকাঠামোর পেছনে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও আলোচনা রয়েছে। অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের পর প্রায় এক যুগের ব্যবধানে ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। অর্থ বিভাগের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের নোটিশ প্রকাশ করা হয়েছিল।
নতুন বেতনকাঠামো তৈরির প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে কাজ করা হয়। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ তৈরির জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে। ওই কমিটি নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে সুপারিশ চূড়ান্ত করে।
এর আগে নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিভিন্ন পক্ষের মতামত ও তথ্য বিবেচনা করে তাদের সুপারিশ প্রস্তুত করে। কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে সরকারের ভেতরে পরবর্তী প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অর্থ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে এর বাস্তবায়নের কাঠামো স্পষ্ট করেছে।
নতুন পে-স্কেল কার্যকরের বিষয়টি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য শুধু বেতন বৃদ্ধির প্রশ্ন নয়, বরং বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবারের মাসিক খরচ, সঞ্চয় এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো পরিবর্তনের প্রত্যাশায় থাকা কর্মচারীদের কাছে তাই প্রজ্ঞাপনের বাস্তবায়ন সময়সূচি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বর্ধিত মূল বেতনের সঙ্গে বিভিন্ন ভাতা যুক্ত হলে মাসিক আয় ও পারিবারিক ব্যয়ের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যদিকে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান এবং বর্ধিত বেতন ও ভাতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেট ব্যবস্থাপনা করা।
প্রজ্ঞাপনে ১ জুলাই থেকে কার্যকারিতা নির্ধারণ করায় এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজর থাকবে বর্ধিত বেতন ও বকেয়া অর্থ পরিশোধের বাস্তব প্রক্রিয়ার দিকে। প্রথম ধাপে নির্ধারিত অংশ কার্যকর হওয়ার পর ২০২৭ সালের জুলাইয়ে পূর্ণ নতুন মূল বেতন কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। আর ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে অন্যান্য ভাতা ও পেনশন সুবিধা নতুন কাঠামোর আওতায় আসবে।
সব মিলিয়ে নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আলোচিত পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলো। এখন এর পরবর্তী ধাপ হবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে নতুন বেতন নির্ধারণ, বকেয়া হিসাব প্রস্তুত এবং ধাপে ধাপে বর্ধিত বেতন বাস্তবায়ন। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য তাই সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে নতুন কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগ এবং বকেয়া অর্থ পাওয়ার সময়সূচি।


