দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বেতন বৃদ্ধির দাবি ও সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিম্নতম মজুরি বোর্ড। বোর্ডের প্রথম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে জানুয়ারি মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন মজুরি পাবেন পোশাকশ্রমিকেরা। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন মজুরি কত নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সভাকক্ষে বৈঠকটি শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বোর্ডের চেয়ারম্যান বিচারক সৈয়দ আজাদ সুবহানী। পোশাকশিল্পের জন্য গঠিত মজুরি বোর্ডের এই প্রথম সভায় শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা গেলে জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করার পথ তৈরি হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়েছে। রাজধানী ঢাকা, সাভার ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ, কর্মবিরতি এবং সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। বুধবারও এসব এলাকার কয়েকটি স্থানে সড়ক অবরোধের খবর পাওয়া গেছে। শ্রমিকদের একটি বড় অংশের দাবি, বর্তমান মজুরি দিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসাভাড়া, যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসা ও পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি দৈনন্দিন জীবনে পড়ছে। ফলে নতুন মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং লাখো শ্রমিকের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনসংক্রান্ত চাপ সামলে কাজ করলেও বর্তমান আয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর অনেক শ্রমিকের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। যাঁদের সন্তান রয়েছে, তাঁদের জন্য শিক্ষা ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যয় বহন করাও বাড়তি চাপ তৈরি করে। ফলে মজুরি বৃদ্ধির দাবির সঙ্গে শ্রমিকদের জীবনমান, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের বিষয়গুলোও জড়িয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ শিল্পে উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, ক্রেতাদের মূল্যচাপ এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতার বিষয়গুলোও নতুন মজুরি নির্ধারণের আলোচনায় বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে মজুরি বোর্ডের আলোচনায় শ্রমিকদের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিল্পের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
বৈঠকে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। দুই পক্ষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে বোর্ডের মাধ্যমে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের বক্তব্য, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্পের সক্ষমতা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠবে।
এর আগে শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে গত ১ নভেম্বর সরকার নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য পৃথক মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন চলার মধ্যেই সরকারের এই উদ্যোগ আসে। নতুন বোর্ড গঠনের মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুনর্গঠিত সাধারণ নিম্নতম মজুরি বোর্ডে নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মালিকপক্ষের স্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের স্থায়ী সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য গঠিত পৃথক বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাবুল আখতারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ ২০২৩ সালের নভেম্বরে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই সময় শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এতে মজুরি বেড়েছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। নতুন মজুরি কার্যকর হয়েছিল পরবর্তী মাস থেকে। তবে এরপর থেকে জীবনযাত্রার ব্যয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং বাসাভাড়ার চাপ নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। শ্রমিকদের দাবি, আগের মজুরি বৃদ্ধির পরও বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁদের আয় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মজুরি বৃদ্ধির দাবি নিয়ে চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নতুন বোর্ডের সিদ্ধান্ত শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে মজুরি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হলেও নতুন বেতন কত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবির বিপরীতে মালিকপক্ষ কী অবস্থান নেয় এবং বোর্ডের আলোচনায় কোন ধরনের প্রস্তাব উঠে আসে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।
নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় মূল্যায়ন করা জরুরি। শুধু ন্যূনতম খাদ্যচাহিদা নয়, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ একজন শ্রমিকের মজুরি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে সেই আয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে পুরো পরিবার। মাস শেষে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমাতে না পারলে শ্রমিকদের ঋণগ্রস্ততা, পুষ্টিহীনতা এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর তা যথাসময়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। কাগজে-কলমে মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি কারখানাগুলোতে নির্ধারিত বেতন পরিশোধ হচ্ছে কি না, শ্রমিকেরা কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই তাঁদের পাওনা পাচ্ছেন কি না এবং নতুন কাঠামো কার্যকর করতে কোনো জটিলতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের দাবি ও মালিকপক্ষের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেলে শিল্পাঞ্চলে চলমান অসন্তোষ কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের পারস্পরিক আস্থা এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশের ওপর। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টি ও উৎপাদনশীলতাও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। অন্যদিকে, আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা গেলে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখার পথও সুগম হতে পারে। এখন ডিসেম্বরের মধ্যে বোর্ড কতটা কার্যকরভাবে আলোচনা শেষ করতে পারে এবং জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তব রূপ পায়, সেটিই পোশাকশ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


